- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সংশোধনবাদের প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের শেষভাগের ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানির সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, যেখানে মার্কসবাদের অভ্যন্তরেই এক নতুন মতবাদের জন্ম হয় যা মার্কসের মৌলিক তত্ত্বগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। এই মতবাদটি পরবর্তীতে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে এবং লেনিন, মাও ও অন্যান্য বিপ্লবীদের তীব্র সমালোচনার শিকার হয়। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক সংশোধনবাদের উৎপত্তি ও প্রেক্ষাপট কী ছিল।
সংশোধনবাদের উৎপত্তি ঘটে উনিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে জার্মানির সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টিতে (এসপিডি), যখন এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন নামক এক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক মার্কসের মৌলিক তত্ত্বগুলোকে পুনর্বিচার করার আহ্বান জানান। ১৮৯৬ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে তিনি “ডি নিউয়ে জাইট” নামক পত্রিকায় একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং ১৮৯৯ সালে “সোশ্যালিজমাস প্রিমিসেস অ্যান্ড দ্য টাস্কস অফ সোশ্যাল ডেমোক্রেসি” নামক গ্রন্থে তাঁর পূর্ণাঙ্গ সংশোধনবাদী কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। বার্নস্টাইন যুক্তি দেন যে মার্কসের কিছু ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণিত হয়েছে—পুঁজিবাদ ধসে পড়ছে না, মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিলুপ্ত হচ্ছে না, এবং শ্রমিক শ্রেণির “বর্ধিত দুর্দশা” ঘটছে না। তাই তিনি বিপ্লবের বদলে গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র অর্জনের পক্ষে মত দেন।
অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপে পুঁজিবাদ স্থিতিশীল হতে শুরু করে এবং অর্থনৈতিক মন্দার বদলে কিছুটা সমৃদ্ধি দেখা যায়। জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে শিল্পায়ন দ্রুত এগিয়ে চলে এবং শ্রমিক শ্রেণির জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হয়। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শ্রমিকরা সংস্কারের মাধ্যমে কিছু অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হয়। এই পরিস্থিতিতে বার্নস্টাইন ও তাঁর অনুসারীরা মনে করেন যে পুঁজিবাদ ধসে পড়বে না, বরং এটি ধীরে ধীরে সংস্কারের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে পারে। তারা মার্কসের শ্রমমূল্য তত্ত্ব, অর্থনৈতিক নির্ধারকবাদ ও শ্রেণী সংগ্রামের গুরুত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: এই সময়ে জার্মানির সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টি (এসপিডি) ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী শ্রমিক দলে পরিণত হয় এবং সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে শুরু করে। ১৮৯০ সালে জার্মানিতে সমাজবিরোধী আইন বাতিল করার পর এসপিডি আইনানুগ রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারে এবং সংসদীয় নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে দলের ভেতরে এক প্রশ্ন জাগে—সংসদীয় রাজনীতিতে অংশ নিয়ে সংস্কার অর্জন করাই কি শ্রমিক শ্রেণির মূল লক্ষ্য, নাকি বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাত করাই আসল কাজ? বার্নস্টাইন ও তাঁর অনুসারীরা প্রথমটির পক্ষে মত দেন, যা দলের ভেতরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়।
তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট: মার্কস ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর (মার্কস ১৮৮৩, এঙ্গেলস ১৮৯৫) মার্কসবাদী আন্দোলনে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয় এবং বিভিন্ন তাত্ত্বিক মার্কসবাদের ব্যাখ্যায় ভিন্ন মত পোষণ করতে শুরু করেন। কার্ল কাউটস্কির মতো নেতারা মার্কসবাদের “বৈজ্ঞানিক” ব্যাখ্যার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু বার্নস্টাইন মনে করতেন যে মার্কসবাদকে নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তিনি হেগেলীয় দর্শনের প্রভাব, কান্টীয় নীতিশাস্ত্র এবং অন্যান্য অ-মার্কসবাদী চিন্তাধারার সাথে মার্কসবাদকে মিশ্রিত করার চেষ্টা করেন, যা মার্কসবাদের বিপ্লবী চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।
শ্রেণীগত প্রেক্ষাপট: লেনিন ও অন্যান্য মার্কসবাদীরা সংশোধনবাদের পেছনে শ্রেণীগত কারণ খুঁজে পান। তাঁদের মতে সংশোধনবাদ হলো বুর্জোয়া শ্রেণির আদর্শ, যা শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। পুঁজিবাদী দেশগুলোতে “শ্রমিক অভিজাত শ্রেণি” (Labor Aristocracy) তৈরি হয়েছে, যারা উপনিবেশিক শোষণ থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত মুনাফার কিছু অংশ পেয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে আপস করতে রাজি। এই শ্রেণিটি শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসে এবং বিপ্লবের বদলে সংস্কারের পক্ষে মত দেয়। লেনিনের মতে সংশোধনবাদ হলো “সুযোগবাদের এক রূপ, যা মার্কসবাদের নাম করে মার্কসবাদের বিপ্লবী বিষয়বস্তুকে ছিনিয়ে নেয়”।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: উনিশ শতকের শেষভাগে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের দিকে এগিয়ে যায় এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকা, এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে। এই সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত মুনাফার কিছু অংশ ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণির উপর বণ্টন করা হয়, যা শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লবী সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সংশোধনবাদীরা যুক্তি দেন যে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ স্থিতিশীল এবং বিপ্লবের কোনো প্রয়োজন নেই—সংস্কারের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র অর্জন করা সম্ভব।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও সংশোধনবাদ: ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপের অধিকাংশ সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টি নিজ নিজ দেশের যুদ্ধে সমর্থন দেয়, যা মার্কসবাদের আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতির পরিপন্থী ছিল। লেনিন এই অবস্থানকে “সামাজিক-বেতাইনবাদ” (Social Chauvinism) হিসেবে সমালোচনা করেন এবং বলেন যে সংশোধনবাদীরা শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতির বদলে জাতীয়তাবাদের পক্ষে চলে গেছে। এই বিভাজনের ফলে ১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (কমিন্টার্ন) গঠিত হয় এবং সংশোধনবাদী সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টিগুলো থেকে বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টিগুলো আলাদা হয়ে যায়।
আধুনিক সংশোধনবাদ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনের মৃত্যুর (১৯৫৩) পর নিকিতা ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে যে সংস্কার শুরু হয়, তাকে মাও সে তুং ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টি “আধুনিক সংশোধনবাদ” হিসেবে সমালোচনা করে। তাঁদের মতে ক্রুশ্চেভ মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মৌলিক নীতিগুলোকে বিকৃত করেছেন এবং পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাথে আপসের নীতি গ্রহণ করেছেন। ১৯৬০-এর দশকে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মতবিরোধ তীব্র হয় এবং বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলন দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়—একদিকে সোভিয়েতপন্থী সংশোধনবাদী পার্টি, অন্যদিকে চীনপন্থী মাওবাদী পার্টি।
উপসংহার: সব মিলিয়ে সংশোধনবাদের প্রেক্ষাপট ছিল উনিশ শতকের শেষভাগের ইউরোপের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ, শ্রমিক শ্রেণির কিছু অধিকার অর্জন এবং পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী শোষণ থেকে প্রাপ্ত অতিরিক্ত মুনাফা। এই পরিস্থিতিতে এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন ও তাঁর অনুসারীরা মার্কসের বিপ্লবী তত্ত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সংস্কারবাদের পক্ষে মত দেন, যা পরবর্তীতে বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে। লেনিন, মাও ও অন্যান্য বিপ্লবীরা সংশোধনবাদকে মার্কসবাদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এর বিরুদ্ধে সংগ্রামকে মার্কসবাদী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন, কারণ সংশোধনবাদ মার্কসবাদের বিপ্লবী চেতনাকে দুর্বল করে দিয়ে সংস্কারবাদ ও সুযোগবাদের পথে ঠেলে দেয়।