- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মার্ক্সবাদী তত্ত্বের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে সমঝোতা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ধারার সৃষ্টি হয়, তাই সংশোধনবাদ নামে পরিচিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে এই নতুন চিন্তাধারার উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।
১। পটভূমি: কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর ইউরোপের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয়। পুঁজিবাদের পতন নিয়ে মার্ক্সের করা কিছু ভবিষ্যৎবাণী তৎকালীন সময়ে হুবহু মেলেনি। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অভ্যন্তরেই মার্ক্সবাদের মূল সূত্রগুলো পুনর্বিবেচনা করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়, যা সংশোধনবাদের পথ সুগম করে।
২। এডুয়ার্ড বার্নস্টাইন: জার্মানির সমাজতান্ত্রিক নেতা এডুয়ার্ড বার্নস্টাইনকে সংশোধনবাদের প্রধান জনক বা প্রবক্তা হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি ১৮৯০-এর দশকে মার্ক্সীয় তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করে দাবি করেন যে পুঁজিবাদ নিজে থেকেই ধ্বংস হচ্ছে না। বরং পুঁজিবাদ দিন দিন আরও শক্তিশালী ও নমনীয় হচ্ছে। তাই তিনি বিপ্লবের চেয়ে সংস্কারের ওপর বেশি জোর দেন।
৩। তাত্ত্বিক ভিত্তি: বার্নস্টাইন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এভোলিউশনারি সোশ্যালিজম’-এ সংশোধনবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিলুপ্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও বিকশিত হচ্ছে। ফলে তিনি মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের চরম সমালোচনা করেন এবং সমাজতন্ত্র অর্জনের পথকে নতুন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
৪। শান্তিপূর্ণ রূপান্তর: সংশোধনবাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো সশস্ত্র বিপ্লবের পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এই ধারার চিন্তাবিদগণ বিশ্বাস করতেন যে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আইনি উপায়ে শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার আদায় এবং সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।
৫। সংসদীয় গণতন্ত্র: সংশোধনবাদী ধারার অনুসারীগণ ব্যালট বা সংসদীয় নির্বাচনকে সমাজ পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁরা মনে করতেন যে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণী সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে। আইনসভার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা বিপ্লবের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং রক্তপাতহীন নিরাপদ মাধ্যম।
৬। শ্রেণী সমঝোতা: মার্ক্সবাদের মূল ভিত্তি যেখানে শ্রেণী সংগ্রাম, সেখানে সংশোধনবাদ শ্রেণী সমঝোতা ও সমন্বয়ের নীতি প্রচার করে। এই মতবাদ অনুযায়ী, সমাজকে কেবল শাসক ও শোষিত—এই দুই ভাগে ভাগ করে সহিংসতা ছড়ানো ঠিক নয়। বরং মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
৭। পুঁজিবাদের সহনশীলতা: সংশোধনবাদীরা মনে করতেন যে পুঁজিবাদ কেবল শোষণের হাতিয়ার নয়, এটি সমাজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পুঁজিবাদের নেতিবাচক দিকগুলো দূর করে এর ইতিবাচক দিকগুলোকে সমাজতন্ত্রের স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব। তাঁরা একচেটিয়া পুঁজিবাদের পতনের চেয়ে এর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছিলেন।
৮। শ্রমিক আন্দোলন: ইউরোপের বিশেষ করে জার্মানি ও ব্রিটেনের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর অর্থনৈতিক সাফল্য সংশোধনবাদের বিকাশকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছিল। শ্রমিকরা যখন ধর্মঘট ও আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নত করতে পারল, তখন তারা সশস্ত্র বিপ্লবের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই বাস্তবমুখী সাফল্য সংশোধনবাদী নেতাদের তত্ত্বকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
৯। ফাবিয়ান সমাজবাদ: ইংল্যান্ডের ফাবিয়ান সোসাইটি সংশোধনবাদের বিকাশে এক বিশাল ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জর্জ বার্নার্ড শ এবং সিডনি ওয়েবের মতো বুদ্ধিজীবীরা মনে করতেন যে সমাজ পরিবর্তন হবে ধীর ও বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায়। ফাবিয়ানদের এই বিবর্তনবাদী চিন্তা সংশোধনবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তিকে ইউরোপজুড়ে আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
১০। কাউতস্কির ভূমিকা: জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেতা কার্ল কাউতস্কি প্রথম দিকে বার্নস্টাইনের সংশোধনবাদের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে নিজের অজান্তেই সংশোধনবাদী ধারাকে পুষ্ট করেন। তিনি মধ্যপন্থা অবলম্বন করেন যা বিপ্লবী ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে এক ধরনের পরোক্ষ সংশোধনবাদে রূপ নেয়। তাঁর এই দোলাচল নীতি মার্ক্সবাদের বিপ্লবী চেতনাকে অনেকটাই দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল।
১১। অর্থনৈতিক বিবর্তন: সংশোধনবাদী অর্থনীতিবিদগণ মনে করতেন যে পুঁজির কেন্দ্রীভবন মার্ক্সের ধারণা অনুযায়ী দ্রুত ঘটছে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত না হয়ে বরং বৃহৎ পুঁজির পাশাপাশি নিজেদের টিকিয়ে রাখছে। শেয়ার বাজারের বিস্তারের ফলে সাধারণ মানুষের মালিকানাও পরোক্ষভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অর্থনৈতিক বিবর্তনকে তাঁরা মার্ক্সবাদের সংশোধনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখান।
১২। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নিজ নিজ দেশের বুর্জোয়া সরকারকে সমর্থন জানিয়ে সংশোধনবাদের চূড়ান্ত রূপ প্রদর্শন করে। তাঁরা সর্বহারা আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতি বিসর্জন দিয়ে জাতীয়তাবাদের জোয়ারে ভেসে যান। যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়ে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো প্রমাণ করে যে তারা বিপ্লবী পথ ত্যাগ করে ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে।
১৩। লেনিনের বিরোধিতা: সংশোধনবাদের এই তীব্র বিকাশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন রুশ বিপ্লবী নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় বার্নস্টাইন ও কাউতস্কির সংশোধনবাদকে বুর্জোয়াদের দালালি এবং চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। লেনিন প্রমাণ করেন যে সংশোধনবাদ আসলে শ্রমিক শ্রেণীকে বিপ্লবের পথ থেকে বিচ্যুত করার একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
১৪। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সংশোধনবাদের চূড়ান্ত বিকাশের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদল সংস্কারপন্থী সামাজিক গণতন্ত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং অন্যদল লেনিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গঠন করে। এই বিভাজনের ফলে সংশোধনবাদ একটি স্থায়ী রাজনৈতিক রূপ লাভ করে যা বিপ্লবী ধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
১৫। সামাজিক গণতন্ত্র: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিম ইউরোপে সংশোধনবাদ ‘সামাজিক গণতন্ত্র’ বা ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিজম নামে এক নতুন রাজনৈতিক রূপ ধারণ করে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোসহ ইউরোপের বহু দেশে এই মতবাদের ভিত্তিতে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই ব্যবস্থায় পুঁজিবাদের অস্তিত্ব বজায় রেখেই ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কাজ নিশ্চিত করা হয়।
১৬। সোভিয়েত সংশোধনবাদ: জোসেফ স্টালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে এক নতুন ধরনের সংশোধনবাদের উদ্ভব ঘটে, যা ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদ নামে পরিচিত। তিনি পুঁজিবাদী দেশগুলোর সাথে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ এবং ‘শান্তিপূর্ণ উত্তরণের’ নীতি ঘোষণা করেন। চিনের কমিউনিস্ট নেতা মাও সেতুং এই নীতির তীব্র বিরোধিতা করে একে আধুনিক সংশোধনবাদ হিসেবে আখ্যা দেন।
১৭। নব্য সংশোধনবাদ: বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সংশোধনবাদ নব্য রূপ ধারণ করে। আধুনিক বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বহু বামপন্থী দল তাদের পুরোনো বিপ্লবী কর্মসূচি পুরোপুরি বর্জন করেছে। তারা এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে খাপ খাইয়ে কেবল মানবাধিকার এবং পরিবেশ রক্ষার মতো সংস্কারবাদী বিষয় নিয়ে রাজনীতি পরিচালনা করছে।
১৮। ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: সামগ্রিক মূল্যায়নে দেখা যায় যে সংশোধনবাদ মার্ক্সবাদের বিপ্লবী চরিত্রকে ক্ষুণ্ন করলেও এটি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে এক ধরনের বাস্তবমুখী রূপ দিয়েছিল। এটি সহিংসতা ছাড়াই শ্রমিক শ্রেণীর জন্য অনেক আইনি ও অর্থনৈতিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রীদের চোখে এটি সর্বদাই পুঁজিবাদের কাছে এক প্রকার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
উপসংহার: সংশোধনবাদের উদ্ভব ও বিকাশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী অধ্যায়। এটি মার্ক্সীয় তত্ত্বের কট্টর গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজ পরিবর্তনের এক রক্তপাতহীন ও বিবর্তনীয় পথ প্রদর্শন করেছে। যদিও বিপ্লববাদীরা একে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখেন, তবুও বর্তমান বিশ্বের বহু কল্যাণকামী রাষ্ট্রে সংশোধনবাদের প্রভাব স্পষ্ট। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এর প্রাসঙ্গিকতা ও কার্যকারিতা আজও সমানভাবে দৃশ্যমান।