- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক, যুক্তিবাদী ও সমাজচিন্তক বার্ট্রান্ড রাসেল (Bertrand Russell) তাঁর রাজনৈতিক ও সমাজদর্শনের অংশ হিসেবে ‘রাজতন্ত্র’ (Monarchy) সম্পর্কে সুচিন্তিত ও বস্তুনিরপেক্ষ মতামত প্রদান করেছেন। তিনি রাজতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন বা অন্ধভাবে সমর্থন না করে, এর গুণাবলী, সীমাবদ্ধতা এবং বিবর্তনকে বিশ্লেষণ করেছেন।
রাজতন্ত্র সম্পর্কে রাসেলের দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. প্রথা ও সামাজিক সংহতি (Social Cohesion): রাসেল তাঁর Power: A New Social Analysis গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, রাজতন্ত্রের একটি বড় গুণ হলো এটি সমাজে সংহতি ও ঐক্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো বিমূর্ত ধারণার (যেমন: সংবিধান বা রাজনৈতিক আদর্শ) চেয়ে একজন ব্যক্তির প্রতি আনুগত্য অনুভব করা সহজ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজতন্ত্র যে ভক্তি ও শ্রদ্ধার অনুভূতি সঞ্চার করেছে, তা সহজে অন্য কোনো নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারে না।
২. ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বের প্রতীক: রাসেল পর্যবেক্ষণ করেন যে, আধুনিক যুগে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে রাজা বা রানীর রাজনৈতিক ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে এলেও তাঁদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মর্যাদা থাকে শীর্ষে। যেমন—ব্রিটেনে রাজার বা রানীর ‘মহিমা’ (Glory) থাকলেও মূল ‘ক্ষমতা’ (Power) থাকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে।
৩. বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা: রাসেল রাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান অসুবিধা হিসেবে বংশানুক্রমিক বা উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরকে চিহ্নিত করেছেন।
- যোগ্য ও মেধাভিত্তিক শাসক পাওয়ার নিশ্চয়তা বংশানুক্রমিক ধারায় থাকে না।
- উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিমত দেখা দিলে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা থাকে।
- দীর্ঘমেয়াদে স্বৈরাচারী রূপ নিলে সাধারণ মানুষের চাহিদা ও অধিকার উপেক্ষিত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি বিপ্লব বা বিদ্রোহ।
৪. রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পরবর্তী রূপান্তর: রাসেল দেখিয়েছেন যে, ঐতিহ্যগত রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হওয়ার পর সেসব দেশে তাৎক্ষণিকভাবে স্থিতিশীল শাসন না এসে প্রায়শই একনায়কতন্ত্র বা ব্যক্তি-শাসনের জন্ম হয়। উদাহরণস্বরূপ—রোমে সম্রাট প্রথা, ইংল্যান্ডে ক্রোমওয়েলের শাসন, ফ্রান্সে নেপোলিয়ন এবং আধুনিক যুগের স্বৈরাচারী শাসনপ্রথা রাজতন্ত্রের বিকল্প হিসেবেই উদ্ভূত হয়েছিল।
৫. গণতন্ত্র ও আধুনিক রাষ্ট্র: রাসেল একজন প্রখর গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ছিলেন। তিনি মনে করতেন, চরম বা নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র প্রগতির পরিপন্থী। তবে কোনো দেশে যদি রাজতন্ত্রকে কেবল একটি অরাজনৈতিক, নিরপেক্ষ ঐতিহ্যবাহী প্রতীক বা রূপক (Constitutional/Symbolic Monarchy) হিসেবে বজায় রেখে প্রকৃত শাসনক্ষমতা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির হাতে ন্যস্ত করা যায়, তবে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সংক্ষেপে, বার্ট্রান্ড রাসেল রাজতন্ত্রকে মানব সভ্যতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধকারী ধাপ মনে করলেও আধুনিক সভ্যতায় প্রগতির স্বার্থে গণতন্ত্র এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার বিস্তারকেই সর্বোত্তম রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।