- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র হলো দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শাসনব্যবস্থা, যেখানে গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ এবং স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো একজন ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী। গণতন্ত্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকে, অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে এই অধিকারগুলো সীমিত বা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা হয়। চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক এই দুটি শাসনব্যবস্থার মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো কী কী।
গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে প্রধান পার্থক্য
১। ক্ষমতার উৎস: গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো জনগণ—জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা শাসন পরিচালনা করে। “জনগণের সরকার, জনগণ দ্বারা, জনগণের জন্য”—এটি গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস হলো একজন ব্যক্তি (স্বৈরশাসক) বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, যারা সাধারণত বলপ্রয়োগ, সামরিক অভ্যুত্থান বা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এবং জনগণের অনুমোদন ছাড়াই শাসন পরিচালনা করে।
২। নেতৃত্ব নির্বাচন: গণতন্ত্রে দেশের নেতা বা সরকার প্রধানকে মুক্ত ও ন্যায্য নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। নির্বাচন নিয়মিত হয় এবং ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তরিত হয়। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে নেতা সাধারণত নির্বাচিত হয় না—সে সামরিক অভ্যুত্থান, বলপ্রয়োগ, বা উত্তরাধিকারের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। নির্বাচন হয় না অথবা হলেও তা প্রহসনে পরিণত হয়।
৩। নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা: গণতন্ত্রে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার যেমন—মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, প্রেসের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা—এগুলো সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। নাগরিকরা সরকারের সমালোচনা করতে পারে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সীমিত বা সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা হয়। সরকারের সমালোচনা করলে শাস্তি দেওয়া হয় এবং নাগরিকরা সর্বদা নজরদারির মধ্যে থাকে।
৪। রাজনৈতিক দল: গণতন্ত্রে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকে এবং তারা মুক্তভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারে। বিরোধী দল সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে সাধারণত একদলীয় শাসন থাকে অথবা রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ থাকে। বিরোধী দল গঠন বা রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো নিষিদ্ধ থাকে।
৫। নির্বাচন ব্যবস্থা: গণতন্ত্রে নিয়মিত, মুক্ত ও ন্যায্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোট দিতে পারে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে নির্বাচন হয় না অথবা হলেও তা প্রহসনে পরিণত হয়। নির্বাচন কমিশন স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ফলাফল কারচুপি করা হয়।
৬। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: গণতন্ত্রে গণমাধ্যম স্বাধীন থাকে এবং সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখে। গণমাধ্যমকে “গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে গণমাধ্যম স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সরকারি প্রচারমাধ্যম হিসেবে কাজ করে। স্বাধীন গণমাধ্যম নিষিদ্ধ থাকে এবং সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন করা হয়।
৭। ক্ষমতার বিভাজন: গণতন্ত্রে ক্ষমতার বিভাজন থাকে—নির্বাহী, বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং একে অপরের ওপর নজর রাখে। চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থা থাকে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতা এককেন্দ্রিক থাকে—স্বৈরশাসক সব বিভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগ স্বৈরশাসকের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
৮। আইনের শাসন: গণতন্ত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকে—”আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান” এই নীতি মেনে চলা হয়। ধনী, দরিদ্র, ক্ষমতাবান নির্বিশেষে সবার ওপর আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে আইনের শাসন থাকে না—স্বৈরশাসক ও তার অনুসারীরা আইনের ওপরে থাকে এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন প্রয়োগ করা হয়।
৯। ক্ষমতা হস্তান্তর: গণতন্ত্রে ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে ও নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়। এক সরকারের মেয়াদ শেষ হলে নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতা হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে হয় না—স্বৈরশাসক মৃত্যুবরণ করলে বা অপসারিত হলে নতুন স্বৈরশাসক ক্ষমতা দখল করে, যা প্রায়শই সহিংসতার মাধ্যমে ঘটে।
১০। জনগণের অংশগ্রহণ: গণতন্ত্রে জনগণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে—ভোট দেয়, রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়, বিক্ষোভ ও মিটিং করে। সরকার জনগণের মতামত গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত বা নিষিদ্ধ থাকে। সরকার জনগণের মতামত গুরুত্ব দেয় না এবং জনগণকে কেবল আদেশ পালন করতে হয়।
১১। দুর্নীতি ও জবাবদিহিতা: গণতন্ত্রে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকে এবং দুর্নীতি দমনের ব্যবস্থা থাকে। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন ও বিচার বিভাগ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেয়। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকে না এবং দুর্নীতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। স্বৈরশাসক ও তার অনুসারীরা দুর্নীতি করেও শাস্তি থেকে মুক্ত থাকে।
১২। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: গণতন্ত্রে সাধারণত মুক্ত বাজার অর্থনীতি বা মিশ্র অর্থনীতি থাকে, যেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের সমন্বয় থাকে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে সাধারণত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থাকে, যেখানে স্বৈরশাসক ও তার অনুসারীরা অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ সীমিত থাকে।
উপসংহার: সব মিলিয়ে গণতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র হলো দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী শাসনব্যবস্থা, যেখানে গণতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস জনগণ, নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত, এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকে। অন্যদিকে স্বৈরতন্ত্রে ক্ষমতার উৎস একজন ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, নাগরিক অধিকার খর্ব করা হয়, এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকে না। গণতন্ত্রে জনগণের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকে, যেখানে স্বৈরতন্ত্রে ভয়, নিপীড়ন ও দমন-পীড়ন চালিয়ে শাসন পরিচালনা করা হয়। তাই বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আজ গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছে এবং স্বৈরতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেছে।