- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মানব সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় সনাতন বা গতানুগতিক সমাজ এক আদিম ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ। আধুনিকতার স্পর্শহীন, প্রাচীন ঐতিহ্য ও প্রথার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সমাজব্যবস্থা আমাদের অতীতের দর্পণ। সহজ-সরল জীবনযাত্রা, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা এবং যৌথ পারিবারিক বন্ধন এই সমাজের মূল ভিত্তি, যা আজও আমাদের সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
১। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি: সনাতন বা গতানুগতিক সমাজের প্রধান চালিকাশক্তি হলো কৃষি। এ সমাজের সিংহভাগ মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য সরাসরি কৃষিকাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকে। উৎপাদন পদ্ধতি অত্যন্ত প্রাচীন এবং তা মূলত পারিবারিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আবর্তিত হয়। উদ্বৃত্ত উৎপাদনের চেয়ে নিজেদের জীবনধারণের জন্য খাদ্যশস্য ফলানোই এখানে মূল লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
২। যৌথ পরিবার প্রথা: এই ধরনের সমাজে যৌথ পরিবার ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিবারের সকল সদস্য একই ছাদের নিচে বসবাস করে। দাদা-দাদি, মা-বাবা, চাচা-চাচি এবং ভাই-বোন মিলে একসাথে বসবাস করার এক দারুণ সংস্কৃতি এখানে দেখা যায়। পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয় এবং সবাই তা মেনে চলে।
৩। ধর্মের গভীর প্রভাব: সনাতন সমাজের মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত প্রবল ও সুদূরপ্রসারী। মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা, উৎসব এবং প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অলৌকিক শক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং পরকালের চিন্তা তাদের জাগতিক জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ধর্মের বাইরে গিয়ে কোনো কিছু করাকে এখানে পাপ মনে করা হয়।
৪। শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন: এই সমাজে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং আন্তরিক হয়। একে অপরের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং যৌথভাবে সামাজিক উৎসব পালন করা এদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যান্ত্রিকতাহীন এই জীবনে কৃত্রিমতার কোনো স্থান থাকে না বললেই চলে। রক্তের টান এবং প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ এখানে অত্যন্ত তীব্র থাকে।
৫। প্রাচীন উৎপাদন পদ্ধতি: গতানুগতিক সমাজে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকায় উৎপাদন ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রাচীন প্রকৃতির হয়। লাঙল, জোয়াল, কাস্তে এবং গৃহপালিত পশুর সাহায্যে জমিতে চাষাবাদ করা হয়ে থাকে। শিল্পকারখানার অনুপস্থিতির কারণে হস্তশিল্প ও কুটির শিল্পের ওপর মানুষ অনেক বেশি নির্ভরশীল থাকে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন ক্ষমতা আধুনিক সমাজের তুলনায় অনেক কম থাকে।
৬। পরিবর্তনের ধীর গতি: সনাতন সমাজব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের পরিবর্তন অত্যন্ত ধীর গতিতে বা ধীর লয়ে আসে। মানুষ নতুন কোনো চিন্তাভাবনা বা আধুনিক প্রযুক্তিকে সহজে গ্রহণ করতে চায় না। যুগের পর যুগ ধরে একই সামাজিক নিয়ম ও প্রথা অপরিবর্তিত অবস্থায় চলতে থাকে। স্থবিরতা বা স্থিতিশীলতা এই সমাজের একটি অন্যতম প্রধান অলংকার বা বৈশিষ্ট্য।
৭। কুসংস্কারের আধিপত্য: বিজ্ঞান ও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকায় এই সমাজে বিভিন্ন কুসংস্কারের রাজত্ব দেখা যায়। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগব্যাধিকে ঈশ্বরের অবমাননা বা ভাগ্যের লিখন বলে মনে করা হয়। যুক্তি ও বিজ্ঞানের চেয়ে অন্ধবিশ্বাস এবং লোককাহিনীর ওপর মানুষ বেশি ভরসা রাখে। ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের প্রতি মানুষের এক অন্ধ মোহ কাজ করে।
৮। অলিখিত সামাজিক আইন: এই সমাজে শাসনব্যবস্থা বা শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য কোনো লিখিত আইন বা সংবিধান থাকে না। সমাজ বড়দের মুখনিঃসৃত বাণী, লোকালয় বা বংশের প্রচলিত নিয়ম এবং প্রথাই আইন হিসেবে গণ্য হয়। পঞ্চায়েত বা গ্রামীণ সালিশের মাধ্যমে সমাজের সব ধরনের বিরোধের মীমাংসা করা হয়ে থাকে। সামাজিক অবমাননার ভয়ে মানুষ অন্যায় কাজ করা থেকে বিরত থাকে।
৯। সীমিত সামাজিক গতিশীলতা: গতানুগতিক সমাজে মানুষের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বা এক পেশা থেকে অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ খুব কম থাকে। সামাজিক গতিশীলতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় মানুষ সাধারণত বংশানুক্রমিক পেশা আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে। জেলের ছেলে জেলে আর তাঁতীর ছেলে তাঁতী হবে, এটাই এ সমাজের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে গণ্য করা হয়।
১০। প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা: এই সমাজের মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য প্রকৃতির ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে। রোদ, বৃষ্টি, বন্যা এবং খরাসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর তাদের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে সমাজ সুখে শান্তিতে থাকে, আর প্রকৃতি রুষ্ট হলে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। তারা প্রকৃতিকে এক মহাশক্তিশালী সত্তা হিসেবে মনে-প্রাণে পূজা বা ভক্তি করে।
১১। বর্ণপ্রথার কঠোরতা: সনাতন সমাজে মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও অবস্থান মূলত জন্মগতভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণপ্রথার কারণে সমাজ বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত থাকে, যা কঠোরভাবে পালন করা হয়। এক বর্ণের মানুষের সাথে অন্য বর্ণের মানুষের সামাজিক মেলামেশা বা বৈবাহিক সম্পর্ক সহজে মেনে নেওয়া হয় না। এই প্রথা সমাজের বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে রাখে।
১২। স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ জীবন: গতানুগতিক সমাজের প্রতিটি গ্রাম বা জনপদ প্রায় সব দিক থেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে থাকে। নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তারা গ্রামের ভেতরেই উৎপাদন বা বিনিময় করে মিটিয়ে নেয়। বাইরের জগতের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা থাকে না বললেই চলে। এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা তাদের বাইরের পৃথিবী থেকে এক প্রকার বিচ্ছিন্ন এবং আত্মকেন্দ্রিক করে রাখে।
১৩। মৌখিক সংস্কৃতির প্রাধান্য: এই সমাজে শিক্ষার হার অত্যন্ত কম থাকায় জ্ঞান ও সংস্কৃতির চর্চা মূলত মৌখিক উপায়ে হয়ে থাকে। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে রূপকথা, লোকগীতি, ধাঁধাঁ এবং প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্থানান্তরিত হয়। লিখিত দলিলের চেয়ে মানুষের মুখের কথার মূল্য এখানে অনেক বেশি থাকে। স্মৃতিশক্তির ওপর ভর করেই সমাজ তার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখে।
১৪। নারীর অধীনস্থ অবস্থান: সনাতন সমাজে নারীদের অবস্থান সাধারণত পুরুষদের অধীনস্থ বা পেছনের সারিতে থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের মতামতের তেমন কোনো মূল্যায়ন বা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তাদের কাজ মূলত চার দেয়ালের মাঝে রান্না-বান্না ও সন্তান লালন-পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রেখে তাদের অধিকার সংকুচিত করা হয়।
১৫। প্রাচীন বিনিময় প্রথা: আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থার প্রচলন ব্যাপক না হওয়ায় এই সমাজে দ্রব্য বিনিময় প্রথা চালু থাকে। মানুষ নিজের উৎপাদিত পণ্যের বিনিময়ে অন্যের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করে থাকে। ধান দিয়ে তেল কেনা বা কাপড়ের বিনিময়ে সবজি নেওয়া এ সমাজের সাধারণ চিত্র। এই সহজ সরল বাণিজ্য পদ্ধতি মানুষের মধ্যে এক ধরণের পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি করে।
১৬। বয়োজ্যেষ্ঠদের চরম সম্মান: এই সমাজে বয়সে বড় বা মুরুব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা বাধ্যতামূলক কর্তব্য মনে করা হয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে পরিবারের এবং সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেওয়া হয়। যেকোনো পারিবারিক সংকট বা সামাজিক বিরোধে তাদের পরামর্শ এবং নির্দেশই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হয়। বৃদ্ধদের অবহেলা করা সমাজে চরম অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।
১৭। সরল জীবনযাপন: এই সমাজের মানুষের চাহিদা অত্যন্ত সীমিত থাকে এবং তারা বিলাসিতাহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়। মৌলিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান সংস্থান হলেই তারা নিজেদের সুখী ও সন্তুষ্ট মনে করে। আধুনিক যুগের তীব্র প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ ও লোভ-লালসা তাদের জীবনকে কলুষিত করতে পারে না। প্রকৃতির কোলে এক ধরণের প্রশান্তি নিয়ে তারা দিনাতিপাত করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, সনাতন বা গতানুগতিক সমাজ হলো মানব সভ্যতার আদি ভিত, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক বিশ্ব গড়ে উঠেছে। কুসংস্কার, স্থবিরতা এবং শিক্ষার অভাব এই সমাজের নেতিবাচক দিক হলেও এর মধ্যকার মানবিকতা ও শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন অতুলনীয়। বর্তমান যুগের যান্ত্রিক ও ব্যস্ত জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে এই সরল সমাজের কিছু মানবিক মূল্যবোধের চর্চা আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি হয়ে পড়েছে।