- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে শাসনভার থাকাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায়শই দেখা যায় বেসামরিক সরকারকে হটিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়। রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর এই অপ্রত্যাশিত ও প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের পেছনে গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ নিহিত থাকে।
রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণসমূহ:
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দলীয় কোন্দল, সহিংসতা এবং ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের কারণে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। বেসামরিক সরকার যখন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তখন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই রাজনৈতিক শূন্যতাই তাদের ডেকে আনে।
২। নেতৃত্বের সংকট: একটি শক্তিশালী ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। জাতীয় সংকটের মুহূর্তে যখন বেসামরিক নেতারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না, তখন জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। এই নেতৃত্বের দুর্বলতাকে পুঁজি করে সামরিক বাহিনী দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় চলে আসে।
৩। ব্যাপক দুর্নীতি: বেসামরিক সরকারের মন্ত্রী, আমলা এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থ পাচার দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। জনমনে সরকারের প্রতি চরম ক্ষোভ ও অনাস্থার সৃষ্টি হয়। সামরিক বাহিনী নিজেদের দুর্নীতিমুক্ত ও ত্রাতা হিসেবে জাহির করে এই সুযোগে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে।
৪। অর্থনৈতিক বিপর্যয়: তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, খাদ্য ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক মন্দা যখন জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তখন সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর আস্থা হারায়। অর্থনৈতিক এই ব্যর্থতা রাষ্ট্রকে দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল করার নামে সামরিক বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করে।
৫। দুর্বল প্রতিষ্ঠান: নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং সংসদের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না, তখন গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। দলীয়করণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের বিশ্বাস উঠে যায়। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী অতি সহজেই শাসনভার নিজের হাতে তুলে নেয়।
৬। সংবিধানের অপব্যবহার: ক্ষমতাসীনেরা যখন নিজেদের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করে এবং বিরোধী দলকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বিষাক্ত হয়ে ওঠে। সংবিধানের প্রতি জনগণের এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শ্রদ্ধা কমে যায়। এই সাংবিধানিক সংকটের সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
৭। বিদেশী শক্তির প্রভাব: অনেক সময় ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে শক্তিশালী বিদেশী রাষ্ট্রগুলো কোনো দেশের দুর্বল বেসামরিক সরকারকে পছন্দ করে না। তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ওই দেশের সামরিক বাহিনীকে উসকানি বা পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন দেয়। বিদেশী শক্তির সবুজ সংকেত ও মদদ পেয়ে সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটাতে উৎসাহিত হয়।
৮। সামরিক আধুনিকায়ন: সামরিক বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক অস্ত্রের সরবরাহ তাদের মধ্যে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধের জন্ম দেয়। তারা নিজেদের বেসামরিক আমলা বা রাজনীতিবিদদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও সুশৃঙ্খল মনে করতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নিতে প্ররোচিত করে।
৯। শ্রেণী স্বার্থ রক্ষা: সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়শই সমাজের উচ্চবিত্ত বা শাসক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। যখন কোনো বেসামরিক সরকার সমাজতান্ত্রিক বা সাধারণ জনগণের কল্যাণে এমন নীতি নেয় যা উচ্চবিত্তের স্বার্থে আঘাত হানে, তখন সামরিক বাহিনী তাদের নিজস্ব ও সমগোত্রীয়দের শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার্থে ক্ষমতা দখল করে।
১০। করপোরেট স্বার্থ: সামরিক বাহিনীর নিজস্ব বাজেট, সুযোগ-সুবিধা, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান এবং পেনশনের মতো নানাবিধ করপোরেট স্বার্থ থাকে। বেসামরিক সরকার যদি সামরিক বাজেট হ্রাস করে বা তাদের ব্যবসায়িক সুবিধায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তবে সামরিক বাহিনী ক্ষুব্ধ হয়। তারা নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতেই মূলত বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থান ঘটায়।
১১। জনগণের সমর্থন: বেসামরিক সরকারের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে সাধারণ মানুষ যখন বিকল্প খুঁজতে থাকে, তখন তারা অনেক সময় সামরিক বাহিনীকে স্বাগত জানায়। রাজনীতিবিদদের প্রতি তীব্র ঘৃণার কারণে জনগণের একটি বড় অংশ সামরিক শাসনকে সাময়িক মুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। জনগণের এই পরোক্ষ সমর্থন সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপকে সহজ করে দেয়।
১২। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি: দেশে যখন চুরি, ডাকাতি, খুন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চরম আকার ধারণ করে, তখন বেসামরিক পুলিশ প্রশাসন তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। জানমালের নিরাপত্তা না পেয়ে নাগরিক সমাজ এক প্রকার অভিভাবকহীনতায় ভোগে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অসিলায় সামরিক বাহিনী ব্যারাকে না থেকে রাজপথে নেমে আসে।
১৩। নির্বাচনী জালিয়াতি: যখন ক্ষমতাসীন দল অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন না করে ভোট কারচুপির আশ্রয় নেয়, তখন গণতন্ত্রের মূল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বিরোধী দলগুলো রাজপথে আন্দোলনে নামে এবং দেশ অচল হয়ে পড়ে। এই নির্বাচনী সংকট ও সহিংসতা নিরসনের নামে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয়।
১৪। ঔপনিবেশিক মানসিকতা: যেসব দেশ দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল, তাদের সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি প্রভুত্বকামী মানসিকতা রয়ে যায়। স্বাধীনতার পরও তারা সাধারণ জনগণকে এবং বেসামরিক প্রশাসনকে নিচু চোখে দেখে। এই মানসিকতার কারণে তারা মনে করে যে দেশ পরিচালনার আসল যোগ্যতা কেবল তাদেরই রয়েছে।
১৫। জাতীয়তাবাদের চেতনা: তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনা বা কোনো জাতীয় সংকটে (যেমন সীমানা বিরোধ বা যুদ্ধাবস্থা) সামরিক বাহিনীর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। এ সময় তারা নিজেদের দেশের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে ভাবতে শুরু করে। বেসামরিক সরকারের কোনো নরম কূটনৈতিক সিদ্ধান্তকে তারা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী মনে করে ক্ষমতা কেড়ে নেয়।
১৬। সামাজিক বিভাজন: জাতিগত, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক বিভাজনের কারণে যখন কোনো দেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন বেসামরিক সরকার তা সামাল দিতে পারে না। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। দেশের অখণ্ডতা রক্ষা এবং গৃহযুদ্ধ থামানোর যৌক্তিকতা দেখিয়ে সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে।
১৭। ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার: যেসব দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সামরিক বাহিনী বা সশস্ত্র বিপ্লবীদের মুখ্য ভূমিকা ছিল, সেখানে তাদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তীব্র থাকে। তারা মনে করে দেশের ওপর তাদের একটি ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে। এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের দোহাই দিয়ে তারা বেসামরিক শাসনের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বা হস্তক্ষেপ করতে চায়।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি বেসামরিক শাসনের ব্যর্থতার একটি দীর্ঘমেয়াদী ফল। একটি দেশে টেকসই গণতন্ত্র, শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা না গেলে সামরিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই ব্যারাকে সামরিক বাহিনীকে সীমাবদ্ধ রাখতে হলে রাজনীতিবিদদের সততা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা করা অপরিহার্য।