- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘রাজনৈতিক উন্নয়ন’ ধারণাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লুসিয়ান পাই। তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘Aspects of Political Development’ গ্রন্থে রাজনৈতিক উন্নয়নের একটি বহুমাত্রিক ও আধুনিক সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক উন্নয়ন হলো সমগ্র সমাজের রূপান্তর এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির একাধারে আধুনিকীকরণ ও গুণগত পরিবর্তন।
১। ধারণার প্রবক্তা: লুসিয়ান পাই হলেন রাজনৈতিক উন্নয়ন তত্ত্বের অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক ও প্রবক্তা। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই তত্ত্বটি প্রদান করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক উন্নয়ন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়, বরং এটি মানুষের আচরণগত পরিবর্তনের সাথেও যুক্ত। তিনি এই ধারণাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।
২। বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া: রাজনৈতিক উন্নয়নকে পাই একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি কেবল সরকারের গঠন বা ভোটদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটায়। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে এক ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী রূপান্তর ঘটে থাকে। তিনি মনে করেন, সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির সাথে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামঞ্জস্য বিধানই হলো এই উন্নয়ন।
৩। সংস্কৃতির পরিবর্তন: রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন ও আধুনিকীকরণ হলো রাজনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। পাই বিশ্বাস করতেন যে, একটি দেশের মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকায়ন না হলে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। প্রাচীন বা ঐতিহ্যবাহী চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে নাগরিকরা যখন আধুনিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গ্রহণ করে, তখনই রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুণগত উৎকর্ষ সাধিত হয়।
৪। তিনটি লক্ষণ: লুসিয়ান পাই রাজনৈতিক উন্নয়নের প্রধান তিনটি বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এই তিনটি বিশেষ লক্ষণ হলো যথাক্রমে সমতা, সামর্থ্য এবং কাঠামোগত পৃথকীকরণ। যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটুকু উন্নত, তা এই তিনটি মানদণ্ডের সাহায্যে খুব সহজেই পরিমাপ করা সম্ভব। এই বৈশিষ্ট্যত্রয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও গতিশীলতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
৫। সমতার ধারণা: সমতা বলতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশের সকল নাগরিকের সমান সুযোগ ও অংশগ্রহণকে বোঝায়। একটি উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমান অধিকার ভোগ করে। নাগরিকরা কোনো বৈষম্য ছাড়াই রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। পাই-এর মতে, সমতা অর্জনের মাধ্যমেই যেকোনো সমাজ প্রগতির পথে এগিয়ে যায়।
৬। সামর্থ্যের বৃদ্ধি: রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবেশের চাহিদা পূরণ করার দক্ষতাকে পাই সামর্থ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। একটি উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান কাজ হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং দাবি-দাওয়া সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। সরকারের নীতিনির্ধারণ এবং তা দক্ষতার সাথে কার্যকর করার ক্ষমতাই হলো এই সামর্থ্য। সামর্থ্য বৃদ্ধি পেলে রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এবং জনগণের প্রতি এর গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বেড়ে যায়।
৭। কাঠামোগত পৃথকীকরণ: রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানের কাজের সুনির্দিষ্ট বিভাজনকে কাঠামোগত পৃথকীকরণ বলা হয়। উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং বিচার বিভাগ নিজ নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করে। এর ফলে কোনো একটি বিভাগের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ বা ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে না। কাজের এই বিশেষীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান রাজনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে।
৮। উন্নয়ন সিনড্রোম: সমতা, সামর্থ্য এবং পৃথকীকরণের এই ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধনকে পাই ‘রাজনৈতিক উন্নয়ন সিনড্রোম’ নামে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এই তিনটি উপাদান পরস্পর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং একটি অপরটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। যেকোনো একটি উপাদানের অনুপস্থিতি রাজনৈতিক উন্নয়নের সামগ্রিক গতিকে ব্যাহত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই সিনড্রোমের সফল কার্যকারিতার ওপরই রাজনৈতিক ব্যবস্থার আধুনিকতা পুরোপুরি নির্ভরশীল।
৯। ছয়টি সংকট: রাজনৈতিক উন্নয়নের পথে প্রতিটি দেশকে প্রধান ছয়টি সংকটের মুখোমুখি হতে হয় বলে পাই মনে করেন। এই সংকটগুলো হলো যথাক্রমে পরিচয়, বৈধতা, অনুপ্রবেশ, অংশগ্রহণ, একীকরণ এবং বণ্টন সংক্রান্ত সমস্যা। একটি উন্নয়নশীল দেশ যখন এই সংকটগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারে, তখনই তার রাজনৈতিক উন্নয়ন ঘটে। এই সংকটগুলো উত্তরণ করা যেকোনো উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
১০। পরিচয়ের সংকট: জাতীয় সংহতি এবং জনগণের মধ্যে একাত্মতার অভাব থেকে এই সংকটের সৃষ্টি হয়। দেশের নাগরিকরা যখন নিজেদের আঞ্চলিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে জাতীয় পরিচয়কে বড় করে দেখে না, তখন এই সমস্যা প্রকট হয়। রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য উপজাতীয় বা সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত মানসিকতা পরিহার করে সুদৃঢ় জাতীয়তাবোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত আবশ্যক। এই সংকট দূর হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত হয়।
১১। বৈধতার সংকট: সরকারের শাসন করার নৈতিক অধিকার এবং জনগণের আনুগত্যের অভাবকে বৈধতার সংকট বলা হয়। যখন দেশের আপামর জনগণ প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিতে পারে না, তখন এই সংকট দেখা দেয়। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্বের জন্য জনগণের সম্মতি ও আস্থা অর্জন করা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। বৈধতার সংকট দূর হলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা আসে।
১২। অনুপ্রবেশের সংকট: সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তসমূহ গ্রামীণ বা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছানোর অক্ষমতাকে অনুপ্রবেশের সংকট বলে। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ যখন দেশের প্রান্তিক জনগণের দোরগোড়া পর্যন্ত পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তখন এই সমস্যা সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতা ও সেবাসমূহকে একদম নিচু স্তর পর্যন্ত কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। এই সংকট দূর হলে সরকারের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
১৩। অংশগ্রহণের সংকট: রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জনগণের অর্থপূর্ণ ও সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগের অভাব থেকে এই সংকট তৈরি হয়। যখন দেশের সচেতন নাগরিকরা ভোটদান বা নীতিনির্ধারণে নিজেদের মতামত প্রকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না, তখন রাজনৈতিক অসন্তোষ দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশের জন্য প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই সংকটের সমাধান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও বেশি গণমুখী করে তোলে।
১৪। একীকরণের সংকট: সমাজের বিভিন্ন ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, উপজাতি ও শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবকে একীকরণের সংকট বলা হয়। একটি রাষ্ট্রে বৈচিত্র্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তাদের মধ্যে যদি ন্যূনতম ঐক্য বা সম্প্রীতি না থাকে তবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম লক্ষ্য হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভেদ দূর করে একটি সুসংহত সমাজ গঠন করা। এই একীকরণ প্রক্রিয়া জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে সাহায্য করে।
১৫। বণ্টনের সংকট: সমাজের সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার অসম বা বৈষম্যমূলক বণ্টন থেকে এই মারাত্মক সংকটের উৎপত্তি হয়। যখন রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা কেবল একটি নির্দিষ্ট উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তিতে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা অত্যন্ত আবশ্যক। এই সংকট দূর হলে সমাজে সামাজিক সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৬। উন্নয়নের গতিশীলতা: লুসিয়ান পাই রাজনৈতিক উন্নয়নকে কোনো স্থির বা স্থবির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেননি, বরং একে একটি চলমান ও গতিশীল প্রক্রিয়া বলেছেন। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের ও বাইরের নানা উপাদানেরও পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই হলো রাজনৈতিক উন্নয়ন। একটি সমাজ যত বেশি গতিশীল হবে, তার রাজনৈতিক উন্নয়নের হারও তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
১৭। পাশ্চাত্যকরণ বনাম আধুনিকীকরণ: পাই রাজনৈতিক উন্নয়নকে কেবল অন্ধভাবে পাশ্চাত্য দেশের অনুকরণ বা পাশ্চাত্যকরণ হিসেবে দেখতে রাজি ছিলেন না। তাঁর মতে, প্রতিটি দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার আলোকেই উন্নয়ন নিশ্চিত করা উচিত। পশ্চিমা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গ্রহণ করলেই উন্নয়ন হয় না, যদি না তা স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। তাই নিজস্ব কৃষ্টি বজায় রেখে আধুনিক চিন্তাভাবনার বিকাশই হলো প্রকৃত উন্নয়ন।
১৮। উপযোগিতা ও গুরুত্ব: রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চায় এবং তুলনামূলক রাজনীতি বিশ্লেষণে লুসিয়ান পাই-এর এই তত্ত্বের উপযোগিতা ও গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের সদ্য স্বাধীন ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনৈতিক জটিলতা বুঝতে এই তত্ত্বটি গবেষকদের বিশেষভাবে সাহায্য করে। তাঁর এই নিয়মতান্ত্রিক ও বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ রাজনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে একটি নতুন দিগন্ত এনে দিয়েছে। আজ অবধি তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অত্যন্ত সমাদৃত।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, রাজনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে লুসিয়ান পাই-এর অভিমত অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, বাস্তবসম্মত এবং তাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ। তিনি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সংকটের স্বরূপ ও তা সমাধানের বাস্তব পথও নির্দেশ করেছেন। তাঁর প্রদর্শিত সমতা, সামর্থ্য ও কাঠামোগত পৃথকীকরণের ধারণাটি আজও রাজনৈতিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় লুসিয়ান পাই সদা স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।