- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার মূল ভিত্তি হলো জাতীয় সংহতি। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রযাত্রার পেছনে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো এই সংহতির অভাব। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের কারণে এসব দেশে প্রায়শই চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, যা সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জাতীয় সংহতির সমস্যা
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র সংঘাত একটি নিয়মিত চিত্র। রাজনৈতিক দলগুলো দেশপ্রেমের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ায় জনগণের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহার জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের অনীহা এবং চরম ক্ষোভের জন্ম নেয়।
২। অর্থনৈতিক বৈষম্য: এসব দেশের একটি বড় সমস্যা হলো ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক ব্যবধান। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকায় সাধারণ মানুষ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ক্ষোভ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। যখন একটি গোষ্ঠী নিজেকে বঞ্চিত মনে করে, তখন তারা জাতীয় মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
৩। আঞ্চলিকতাবাদ: উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে প্রায়শই চরম অসম উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়। কেন্দ্র বা নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলের অতিরিক্ত উন্নয়ন এবং প্রান্তিক অঞ্চলের অবহেলা আঞ্চলিকতাবাদের জন্ম দেয়। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ তখন নিজেদের অবহেলিত ভেবে আলাদা পরিচয়ে সংগঠিত হতে শুরু করে। এই আঞ্চলিক স্বার্থপরতা এবং সংকীর্ণ মানসিকতা সামগ্রিক জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে তোলে।
৪। নৃগোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব: অনেক উন্নয়নশীল দেশে বহু জাতি, উপজাতি ও নৃগোষ্ঠীর মানুষ একত্রে বসবাস করে থাকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃগোষ্ঠী যখন সংখ্যালঘুদের ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকারকে অবজ্ঞা করে, তখন জাতিগত সংঘাতের সূত্রপাত হয়। নিজেদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদে সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলো তখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বা অহিংস আন্দোলনে লিপ্ত হয়। এই নৃগোষ্ঠীগত বা জাতিগত সংঘাত জাতীয় সংহতি অর্জনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট অন্তরায়।
৫। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা: ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে না পারা উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি অন্যতম প্রধান দুর্বলতা। বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার অভাব প্রায়শই বড় ধরনের দাঙ্গা বা সংঘাতের রূপ নেয়। রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করার ফলেও এই জাতীয় বিভাজন আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ধর্মীয় উগ্রবাদ ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব নাগরিকদের মধ্যে একতার পরিবর্তে দেয়াল তৈরি করে।
৬। দুর্নীতি: প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্তরে সর্বগ্রাসী দুর্নীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি স্থায়ী ব্যাধি হিসেবে রূপ নিয়েছে। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কারণে যোগ্য ব্যক্তিরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে জনগণের আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে যায়। আইনের শাসন বিঘ্নিত হলে সমাজে এক চরম হতাশা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা এবং ক্ষোভ জাতীয় সংহতির ভিত্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়।
৭। শিক্ষার অভাব: একটি সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া জাতীয় সংহতি এবং ঐক্য বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও মানসম্মত এবং আধুনিক শিক্ষার আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। শিক্ষার অভাবের কারণে মানুষের মধ্যে কুসংস্কার, সংকীর্ণতা ও অন্ধত্বের মতো নেতিবাচক বিষয়গুলো সহজে বাসা বাঁধে। সচেতনতার অভাবে সাধারণ মানুষ সহজেই স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানিতে বিভ্রান্ত হয়ে জাতীয় ঐক্যে ফাটল ধরায়।
৮। ঔপনিবেশিক শাসনকাল: বর্তমান উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেশিরভাগই অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশী ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। তৎকালীন শাসকেরা তাদের শাসন টিকিয়ে রাখতে সমাজে ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ নীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করেছিল। স্বাধীনতার পরও সেই ঐতিহাসিক বিভাজনের ক্ষত এবং গোষ্ঠীগত বৈরিতা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি। ঔপনিবেশিক আমলের সেই কৃত্রিম বিভাজন আজও এসব দেশের জাতীয় সংহতি গঠনে বড় বাধা।
৯। ভাষাগত বিরোধ: বহুভাষী রাষ্ট্রে ভাষার প্রশ্নে সংহতি রক্ষা করা একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়। রাষ্ট্র যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাকে চাপিয়ে দিতে চায়, তখন অন্য ভাষাভাষী মানুষেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক সময় দেশের অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। পারস্পরিক যোগাযোগের সুষ্ঠু মাধ্যমের অভাব এবং ভাষাগত বৈষম্য জাতীয় সংহতিকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে থাকে।
১০। দুর্বল নেতৃত্ব: জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজন দূরদর্শী, অসাম্প্রদায়িক এবং সর্বজনগ্রাহ্য এক শক্তিশালী নেতৃত্ব। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়শই সংকীর্ণ ও স্বার্থান্বেষী নেতৃত্বের আধিপত্য লক্ষ্য করা যায়। এই নেতারা সমগ্র জাতির কথা চিন্তা না করে নিজেদের গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। ক্যারিশম্যাটিক ও জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অভাবে সাধারণ মানুষকে এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব হয় না।
১১। বহিরাগত হস্তক্ষেপ: ভূ-রাজনৈতিক কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রায়শই শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপের শিকার হয়। বিদেশী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে এসব দেশের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাতকে আরও উসকে দেয়। তারা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা দলকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে গৃহযুদ্ধাবস্থা বজায় রাখে। এই বহিরাগত হস্তক্ষেপ ও কূটকৌশল অনুন্নত দেশগুলোর জাতীয় সংহতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।
১২। আইনের অপপ্রয়োগ: সমাজে শান্তি ও সংহতি বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো আইনের নিরপেক্ষ ও সুশাসন নিশ্চিত করা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায়শই আইন ধনী ও ক্ষমতাশালীদের পক্ষে এবং দরিদ্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। আইনের এই দ্বিমুখী নীতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাধারণ মানুষের মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয়। রাষ্ট্র যখন নাগরিকদের সমান সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন জাতীয় সংহতি ভেঙে পড়ে।
১৩। গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্ব: একটি দেশের গণমাধ্যম জাতীয় ঐক্য ও জনমত গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে গণমাধ্যমগুলো প্রায়শই নিরপেক্ষতা হারিয়ে কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর মুখপত্র হিসেবে কাজ করে। সত্য গোপন করে বা উসকানিমূলক সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে তারা সমাজে বিভেদ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়। গণমাধ্যমের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ ও পক্ষপাতিত্ব জাতীয় সংহতি বিনষ্টের অন্যতম কারণ।
১৪। বেকারত্ব: উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট হলো যুবসমাজের মধ্যে বিপুল বেকারত্ব। কর্মসংস্থানের অভাবে তরুণ সমাজ চরম হতাশা, মাদকাসক্তি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হয়। এই হতাশ যুবসমাজকে স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো খুব সহজেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। তরুণদের এই বিপথগামিতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ জাতীয় সংহতিকে বিপন্ন করে তোলে।
১৫। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: দেশের কোনো অঞ্চল যদি ভৌগোলিক কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা যাতায়াত অনুপযোগী হয়, তবে সেখানে সংহতির সমস্যা দেখা দেয়। দুর্গম পাহাড়, দ্বীপ বা সীমান্ত এলাকার মানুষ সহজে মূল স্রোতোধারার সঙ্গে মিশতে পারে না। যোগাযোগের এই অভাবের কারণে তারা নিজেদের রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অবহেলিত মনে করে। ভৌগোলিক দূরত্ব মানসিক দূরত্বে রূপ নিয়ে অবশেষে জাতীয় সংহতিকে চরমভাবে বিঘ্নিত করে।
১৬। সুশীল সমাজের নিষ্ক্রিয়তা: একটি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ বা সুশীল সমাজ সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সুশীল সমাজ প্রায়শই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত বা সরকারের ভয়ে নিষ্ক্রিয় থাকে। অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অভাব সমাজকে আরও বেশি মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়। সুশীল সমাজের এই নিষ্ক্রিয়তা জাতীয় সংকটকালে সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
১৭। ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান: অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশের সংবিধানে সব জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় না। সংবিধান যদি কোনো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সংস্কৃতিকে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করে, তবে বাকিরা বঞ্চিত বোধ করে। এই আইনি ও সাংবিধানিক বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়। একটি অসাম্য ও পক্ষপাতদুষ্ট দলিল কখনো সমগ্র জাতিকে একতাবদ্ধ রাখতে পারে না।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অস্তিত্ব রক্ষা এবং সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য জাতীয় সংহতি এক অপরিহার্য উপাদান। উপরিউক্ত সমস্যাগুলো দূর করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ। দেশের সকল নাগরিকের মৌলিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল একটি সুদৃঢ় ও অখণ্ড জাতীয় সংহতি গড়ে তোলা সম্ভব। সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এসব দেশকে একটি স্থিতিশীল ও উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে।