- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। বিগত কয়েক দশকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হিসেবে বারবার প্রমাণিত হয়েছে।
বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই” – এর ব্যাখ্যা:
১। রাজনৈতিক সংকট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রধান দলগুলোর মধ্যে চরম পারস্পরিক অনাস্থা ও গভীর অবিশ্বাসের পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সবসময়ই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে এবং বিরোধী দলগুলো তা বয়কট করে। এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। তাই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে।
২। জনআকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন: দেশের সাধারণ মানুষ সর্বদা একটি ভীতিহীন ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণ ভোটাররা দলীয় সরকারের চেয়ে অরাজনৈতিক ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের ওপর বেশি ভরসা পায়। যখন একটি অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার দায়িত্ব পালন করে, তখন ভোটারদের মনে আস্থা ফিরে আসে। জনগণের এই তীব্র জনআকাঙ্ক্ষা ও ভোটাধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অত্যন্ত জরুরি।
৩। নিরপেক্ষ প্রশাসন: দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন, বিশেষ করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসন অনেক সময় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ চাপে থাকে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্যই থাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এবং নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখা। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর আমলাতন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে পুনর্গঠন করে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ভয় বা প্রলোভন ছাড়াই সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
৪। সমান সুযোগ: নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করা সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান শর্ত। দলীয় সরকারের অধীনে সরকারি দল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, প্রটোকল এবং গণমাধ্যমকে নিজেদের প্রচারে ব্যবহার করার বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। অন্যদিকে, একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকলে কোনো দলই এই বাড়তি রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করতে পারে না। ফলে সব দল সমান সুযোগ নিয়ে জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার অধিকার পায়।
৫। নির্বাচন কমিশন: একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছাড়া কখনো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। দলীয় সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশন প্রায়শই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে নানামুখী অদৃশ্য চাপের মুখোমুখি হয় বলে অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় এবং তাদের কাজে সব ধরনের প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করে। এর ফলে কমিশন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নিজস্ব আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে।
৬। সহিংসতা হ্রাস: বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ও রক্তপাত ঘটে। সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। তবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সব পক্ষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি কাজ করে এবং রাজনৈতিক দলগুলো শান্ত থাকে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে নির্বাচনী সহিংসতা অনেকাংশে কমে আসে।
৭। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: বর্তমান বিশ্বে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের স্বচ্ছতার ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি ও সমর্থন নির্ভর করে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে অনেক সময় বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীরা প্রশ্ন তোলে। কিন্তু একটি নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন হলে তার গ্রহণযোগ্যতা বিশ্ব দরবারে বহুগুণ বেড়ে যায়। এটি দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মসৃণ রাখতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
৮। ভোটাধিকার সুরক্ষা: গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত হলো নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার এবং সেই ভোটের সঠিক গণনা নিশ্চিত করা। অতীতে দেখা গেছে, দলীয় প্রভাবের কারণে অনেক সময় সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোটটি দিতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এমনভাবে জোরদার করে যেন কোনো জালভোট বা কেন্দ্র দখলের ঘটনা না ঘটে। প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র ভোটাধিকার সুরক্ষায় এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত কার্যকর ও সফল প্রমাণিত হয়েছে।
৯। বিরোধী দলের আস্থা: শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্য ও কার্যকারিতা কোনোভাবেই বজায় রাখা সম্ভব নয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে কারচুপির আশঙ্কায় বিরোধী দলগুলো প্রায়শই নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে নির্বাচন একতরফা হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি বিরোধী দলগুলোর পূর্ণ আস্থা থাকে বিধায় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়, যা বহুদলীয় গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে।
১০। অনাস্থা দূরীকরণ: বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ বা সমঝোতার সংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরে অনুপস্থিত। একে অপরের প্রতি এই চরম অনাস্থা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি নিরপেক্ষ সেতু হিসেবে কাজ করে যা দলগুলোর মধ্যকার তীব্র অনাস্থা সাময়িকভাবে দূর করতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, নিরপেক্ষ ব্যবস্থার কারণে তা মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।
১১। কালোটাকা নিয়ন্ত্রণ: নির্বাচনে অবৈধ অর্থের ব্যবহার এবং পেশিশক্তির প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বড় একটি রোগ বা অভিশাপ। দলীয় সরকারের আমলে অনেক সময় প্রভাবশালী প্রার্থীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অর্থ ও পেশিশক্তি প্রদর্শন করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কঠোর আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই কালোটাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে পারে। এর ফলে সৎ, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সুযোগ পান।
১২। জনমতের সঠিক প্রকাশ: একটি দেশের সরকার জনগণের ইচ্ছায় গঠিত হবে নাকি শক্তির জোরে, তা নির্ধারণ করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। দলীয় সরকারের অধীনে অনেক সময় প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন ঘটে না, বরং ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র ফুটে ওঠে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে না বিধায় ব্যালট বাক্সে প্রকৃত জনমতের সঠিক প্রকাশ ঘটে। জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দিয়ে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়ার সুযোগ পায়।
১৩। স্থিতিশীলতা রক্ষা: নির্বাচনের আগে ও পরে দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে হরতাল, অবরোধ ও আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। নির্দলীয় সরকার দায়িত্ব নিলে দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সাধারণ নাগরিকেরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারা জানে যে এই সরকার কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে দেবে না।
১৪। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত হলো গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ। দলীয় সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় সরকারের নানা বিধি-নিষেধ ও চাপের মুখে পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাংবাদিকরা কোনো ধরনের সেন্সরশিপ বা ভীতি ছাড়াই নির্বাচনী প্রচার ও অনিয়মের খবর প্রকাশ করতে পারেন। এই অবাধ তথ্যপ্রবাহ ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
১৫। আইনি সংস্কার: তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার করতে পারে। যেহেতু তাদের কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ থাকে না, তাই তারা দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয়। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা, ছবিসহ ভোটার আইডি কার্ড নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এ ব্যবস্থার মাধ্যমেই সুচারুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
১৬। জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে জবাবদিহিতার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ে কারণ তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসে এবং তাদের একমাত্র জবাবদিহিতা থাকে সংবিধান ও জনগণের কাছে। এই ব্যবস্থার ফলে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়মে সম্পন্ন হয়।
১৭। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা: বাংলাদেশে বারবার সামরিক শাসন বা অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের কালো অধ্যায় আমরা দেখেছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ সাংবিধানিক এবং একটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের চমৎকার মাধ্যম। এটি কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেয় না, বরং গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। তাই দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুসংহত ও চিরস্থায়ী করতে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই। ক্ষমতার লোভ ও পারস্পরিক অনাস্থার ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অপরিসীম। একটি সুসংহত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনা জরুরি। তবেই দেশের সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার এবং প্রকৃত গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।