- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা অপরিহার্য। বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কাজ করছে। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ এই সংস্থাটির গঠন এবং কার্যাবলি অত্যন্ত বিস্তৃত, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে মূল ভূমিকা পালন করে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের গঠন ও কার্যাবলি:
১। কমিশনের আইনগত ভিত্তি: দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে এই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। পূর্বতন দুর্নীতি দমন ব্যুরোকে বিলুপ্ত করে একটি শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুদককে রূপ দেওয়া হয়। এটি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার আইনি ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। এর মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনের সকল স্তর থেকে দুর্নীতি দূর করা।
২। কমিশনের সদস্য কাঠামো: দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধানত তিন জন কমিশনারের সমন্বয়ে গঠিত হয়, যাঁদের মধ্য থেকে এক জনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কমিশনারদের নিয়োগ দেন স্বয়ং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। কমিশনারদের কার্যকাল সাধারণত তাঁদের দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। এই তিন সদস্যের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই কমিশনের যাবতীয় নীতি ও আইনি পদক্ষেপ নির্ধারিত হয়।
৩। সার্চ কমিটির ভূমিকা: কমিশনারদের স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশিষ্ট ‘বাছাই কমিটি’ বা সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের এই বাছাই কমিটির নেতৃত্বে থাকেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন মাননীয় বিচারপতি। এই কমিটি যাচাই-বাছাই করে প্রতি পদের বিপরীতে দুই জন যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশ করে। রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর তাঁরা কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
৪। কমিশনারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা: কমিশনের দায়িত্ব পালনের জন্য কমিশনারদের অবশ্যই আইন, প্রশাসন, বিচার বিভাগ বা দুর্নীতি সনাক্তকরণে সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। আইন অনুযায়ী তাঁদের শিক্ষা ও পেশাগত জীবনে অনন্য মেধার স্বাক্ষর এবং সৎ ভাবমূর্তি থাকা বাধ্যতামূলক। অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের এখানে নিয়োগ দেওয়া হয় যেন তাঁরা জটিল অর্থনৈতিক অপরাধগুলো সহজে ধরতে পারেন। এই যোগ্যতা কমিশনের কাজের গুণগত মান ধরে রাখতে সাহায্য করে।
৫। কমিশনের নিজস্ব সচিবালয়: দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী নিজস্ব সচিবালয় রয়েছে। এই সচিবালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে একজন সচিব দায়িত্ব পালন করেন, যিনি সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সচিবের অধীনে বিভিন্ন অনুবিভাগ, জেলা কার্যালয় এবং সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করেন। এই প্রশাসনিক কাঠামো কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে।
৬। দুর্নীতির অনুসন্ধান পরিচালনা: কমিশনের অন্যতম প্রধান কাজ হলো যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান করা। নাগরিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত লিখিত অভিযোগ বা গণমাধ্যমের খবরের ওপর ভিত্তি করে দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করে। নির্ধারিত অনুসন্ধান কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনীয়তা ও দক্ষতার সাথে প্রাথমিক তথ্য এবং তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে আইনি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া হয়।
৭। নিয়মিত তদন্ত সম্পন্নকরণ: প্রাথমিক অনুসন্ধানে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করার অনুমোদন দেয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আইনানুযায়ী বিস্তারিত তদন্ত কার্য পরিচালনা করেন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেন। তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করা হয়। এই তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিখুঁত ও আইনসম্মত উপায়ে সম্পন্ন করতে হয়।
৮। মামলা দায়ের ও পরিচালনা: দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ জজ আদালতে মামলা দায়ের ও সফলভাবে পরিচালনা করা দুদকের দায়িত্ব। কমিশনের নিজস্ব প্যানেল আইনজীবী বা প্রসিকিউটরগণ আদালতে সরকারের পক্ষে অত্যন্ত শক্তভাবে মামলাগুলো লড়ে থাকেন। অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়। দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে দুদক সবসময় সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে।
৯। অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ: দুর্নীতি বা অসদুপায়ে অর্জিত যেকোনো স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক এবং বাজেয়াপ্ত করার আইনি ক্ষমতা দুদকের রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পত্তির মালিক হন, তবে দুদক তা তদন্ত করে। আদালতের নির্দেশে সেই অবৈধ সম্পদ সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এটি দুর্নীতিবাজদের অর্থনৈতিক ভিত পুরোপুরি ভেঙে দিতে অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ।
১০। দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম: কেবল শাস্তি দেওয়াই নয়, বরং সমাজে দুর্নীতি যাতে না ঘটে সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দুদকের কাজ। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতির উৎসগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধের জন্য কমিশন সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূরীকরণে বিভিন্ন সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা তৈরি করে তা বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
১১। জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রচারণা: দুর্নীতিবিরোধী গণসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে দুদক বছরব্যাপী নানামুখী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। পোস্টার, লিফলেট, সেমিনার এবং গণমাধ্যমের সহায়তায় সততার চর্চা বাড়াতে জনগণকে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করা হয়। সমাজের সকল স্তরের মানুষকে দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে জানিয়ে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে আহ্বান জানানো হয়। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে এই সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
১২। সততা সংঘ গঠন: তরুণ প্রজন্মের মাঝে নৈতিকতা ও সততার বীজ বপন করার উদ্দেশ্যে দুদক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘সততা সংঘ’ গঠন করে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত এই সংঘ নিয়মিত বিভিন্ন নীতিশিক্ষামূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনমনীয় মনোভাব নিয়ে গড়ে ওঠার শিক্ষা পায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৎ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এটি অনন্য উদ্যোগ।
১৩। সততা স্টোর স্থাপন: দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিক্রেতাবিহীন আদর্শ দোকান বা ‘সততা স্টোর’ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। এই দোকানগুলোতে কোনো বিক্রেতা থাকে না, শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রয়োজনীয় খাতা-কলম কিনে বাক্সে টাকা রেখে দেয়। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সততা ও নৈতিকতার বাস্তব পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং তাদের চরিত্র গঠন করা হয়। এই চর্চা কিশোর মনে সততার এক গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
১৪। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা রক্ষা: বর্তমান যুগে দুর্নীতির পরিধি আন্তর্জাতিক রূপ নেওয়ায় দুদক বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থার সাথে নিবিড় সহযোগিতা রক্ষা করে চলে। জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী সনদের (UNCAC) আলোকে দুদক অন্যান্য দেশের দুর্নীতি দমন সংস্থার সাথে তথ্য আদান-প্রদান করে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স চাওয়া হয়। এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে বড় ভূমিকা রাখে।
১৫। বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ: দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতি বছর মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট তার যাবতীয় কাজের একটি বিস্তারিত বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করে। এই প্রতিবেদনে বিগত বছরের অনুসন্ধান, তদন্ত, মামলা এবং প্রতিরোধমূলক কাজের একটি স্বচ্ছ খতিয়ান তুলে ধরা হয়। রাষ্ট্রপতি মহোদয় পরে এই প্রতিবেদনটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। এর মাধ্যমে দেশের আইনসভার কাছে কমিশনের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
১৬। হটলাইন ১০৬ পরিচালনা: সাধারণ মানুষ যাতে খুব সহজে ও দ্রুত দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য দুদক ‘১০৬’ হটলাইন চালু করেছে। যেকোনো নাগরিক এই টোল-ফ্রি নম্বরে কল করে সরাসরি কমিশনের কাছে দুর্নীতির তথ্য বা অভিযোগ প্রদান করতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম তাৎক্ষণিক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে অপরাধ প্রতিহত করে। এই প্রযুক্তিবান্ধব সেবাটি জনগণের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় ও কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।
১৭। কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা: কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে আইনগতভাবে সম্পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের বাজেট থেকে প্রতি বছর কমিশনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তহবিল বরাদ্দ করা হয়, যা ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুদক স্বাধীন। নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে কমিশনকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। এই আর্থিক স্বাবলম্বিতা কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অত্যন্ত সাহায্য করে।
সমাপনি: দুর্নীতি দমন কমিশন বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার ক্ষেত্রে এক অতন্দ্র প্রহরী। আইনি সীমাবদ্ধতা ও নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা বজায় থাকলে দুদক দেশকে একটি সুশাসিত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সফল হবে।