- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতি। এটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে উন্নয়নের গতিকে স্তিমিত করে দেয়। দুর্নীতি কেবল অর্থের অপচয় ঘটায় না, বরং ন্যায়বিচার ও সুশাসনের পথকে রুদ্ধ করে। সহজ কথায়, দুর্নীতি হলো একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক ও নীরব ঘাতক।
দুর্নীতি যেভাবে উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে
১। অর্থনৈতিক ক্ষতি: দুর্নীতি একটি দেশের জাতীয় রাজস্ব আয়ের বিশাল অংশ অবৈধভাবে গ্রাস করে। এর ফলে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেয়। রাস্তাঘাট, ব্রিজ বা কালভার্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের বাজেট সংকুচিত হয়ে পড়ে। আলটিমেটলি, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা মন্থর হয়ে যায়।
২। অবকাঠামোর নিম্নমান: দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজব্যবস্থায় নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়। ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের ঘুষের লেনদেনে প্রকল্পের গুণগত মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে নতুন তৈরি রাস্তা বা সেতু অল্প দিনেই ভেঙে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই অনিয়ম দেশের টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের পথকে পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেয়।
৩। বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা: বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে পুঁজি খাটানোর সাহস পান না। ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে পদে পদে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হতে হয়। এর ফলে বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হয় এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়। কোনো দেশ বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থ হলে তার শিল্পায়ন ও আধুনিকায়ন থমকে দাঁড়ায়।
৪। মেধার অবমূল্যায়ন: দুর্নীতি যখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়, তখন যোগ্যতা ও মেধার কোনো মূল্য থাকে না। অর্থ বা স্বজনপ্রীতির জোরে অযোগ্য ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার সুযোগ পায়। এর ফলে প্রকৃত মেধাবীরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, যাকে আমরা মেধা পাচার বলি। যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দেশের প্রশাসনিক ও কারিগরি খাতের উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে।
৫। দরিদ্রতার বৃদ্ধি: দুর্নীতি সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্যকে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে তোলে। দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সাহায্য, ত্রাণ বা অনুদান দুর্নীতিবাজদের পকেটে চলে যায়। ফলে গরিব মানুষ আরও বেশি গরিব হয় এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এটি দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির মূল লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে দেয়।
৬। শিক্ষা খাতের ক্ষতি: শিক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রবেশ করলে পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে দেয়। অযোগ্য শিক্ষকের কারণে শিক্ষার্থীরা সঠিক ও আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করা থেকে বঞ্চিত হয়। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হলে কোনো দেশের পক্ষেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
৭। চিকিৎসা সেবায় সংকট: স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি সরাসরি মানুষের জীবনের ওপর আঘাত হেনে থাকে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় জালিয়াতি এবং নকল ওষুধের কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা পায় না। সরকারি বিনামূল্যে পাওয়ার যোগ্য ওষুধ কালোবাজারে বিক্রি হয়ে যায় যা দুঃখজনক। এর ফলে দেশের মানুষের গড় আয়ু ও কর্মক্ষমতা উভয়ই হ্রাস পেতে থাকে।
৮। প্রশাসনিক স্থবিরতা: সরকারি দপ্তরে যেকোনো ফাইল অনুমোদনের জন্য ঘুষ দেওয়া একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। ঘুষ ছাড়া সাধারণ মানুষ কোনো বৈধ নাগরিক সেবা সময়মতো সহজে পায় না। এর ফলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বাড়ে এবং প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা নষ্ট হয়। এই স্থবিরতা সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতি বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে।
৯। আইনের শাসনের অভাব: বিচার বিভাগ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দুর্নীতি থাকলে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল নষ্ট হয়। অপরাধীরা অর্থের জোরে পার পেয়ে যায় এবং নিরীহ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে থাকে। আইনের শাসন না থাকলে টেকসই উন্নয়ন কখনোই স্থায়ী হতে পারে না।
১০। সম্পদের অপচয়: দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা এমন সব প্রকল্প গ্রহণ করেন যা দেশের জন্য অপ্রয়োজনীয়। কেবল নিজেদের পকেট ভারী করার উদ্দেশ্যে বিশাল বাজেটের প্রকল্প তৈরি করা হয়। এর ফলে জনগণের করের টাকার অপচয় হয় এবং দরকারি খাতগুলো অবহেলিত থাকে। এই ধরনের অপরিকল্পিত কাজ দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১১। পরিবেশের বিপর্যয়: নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বনাঞ্চল ধ্বংস, নদী দখল বা কলকারখানার ছাড়পত্র দেওয়া হয়। পরিবেশ আইন অমান্য করে পরিবেশের ক্ষতি করার সুযোগ করে দেয় দুর্নীতি। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বেড়ে যায়। পরিবেশের ক্ষতি করে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন টেকসই হয় না।
১২। ঋণখেলাপি সংস্কৃতি: ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির কারণে অযোগ্য ব্যক্তিদের কোটি কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই বিশাল অংকের অর্থ আর ব্যাংকে ফেরত আসে না। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয় এবং সাধারণ আমানতকারীরা ঝুঁকিতে পড়েন। দেশের আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
১৩। মানবসম্পদ খাতের অবক্ষয়: একটি দেশের প্রধান শক্তি হলো তার কর্মক্ষম ও দক্ষ যুবসমাজ। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কারণে যুবসমাজ হতাশ হয়ে পড়ে। অনেকে মাদক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত হয় যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যুবসমাজের এই নৈতিক অবক্ষয় দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
১৪। বৈদেশিক সাহায্যের হ্রাস: আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঋণ বা অনুদান দিতে অনীহা প্রকাশ করে। তারা মনে করে, তাদের দেওয়া অর্থ প্রকৃত জনকল্যাণে ব্যয় না হয়ে লোপাট হবে। বৈদেশিক সাহায্য কমে গেলে দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলো উন্নয়নের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে।
১৫। মূল্যস্ফীতির চাপ: বাজার তদারকিতে দুর্নীতি এবং অবৈধ সিন্ডিকেটের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। ব্যবসায়ীরা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে ইচ্ছামতো দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটে। এর ফলে বাজারে তীব্র মূল্যস্ফীতি দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে ওঠে। জনগণের জীবনযাত্রার মান না বাড়লে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না।
১৬। সামাজিক নিরাপত্তার অভাব: সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য সরকার যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে, সেখানেও দুর্নীতি হয়। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা বা প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকৃত ভুক্তভোগীরা এই সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। এটি একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
১৭। জাতীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কোনো দেশ যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে পরিচিতি পায়, তবে তার সম্মান নষ্ট হয়। অন্যান্য দেশ সেই দেশের সাথে ব্যবসায়িক বা কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে দ্বিধা করে। পর্যটন শিল্পেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, কারণ পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বৈশ্বিক মঞ্চে পিছিয়ে পড়লে দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।
১৮। প্রযুক্তির অপব্যবহার: ডিজিটাল যুগের নানা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালানো হলেও দুর্নীতি তাতে বাধা দেয়। দুর্নীতিবাজ চক্র প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার মধ্যেও ফাঁকফোকর বের করে অর্থ আত্মসাৎ করার পথ খোঁজে। ই-টেন্ডারিং বা অনলাইন সেবাকে বাধাগ্রস্ত করে তারা পুরনো সনাতন পদ্ধতিতে ফিরে যেতে চায়। ফলে দেশ আধুনিক ও স্মার্ট হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে পড়ে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, দুর্নীতি হলো উন্নয়নের প্রধান শত্রু যা একটি জাতির অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। এটি সমাজের নৈতিকতা ধ্বংস করে এবং অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে। তাই দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। সর্বস্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল দুর্নীতিমুক্ত প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব।