- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: রাষ্ট্রের ক্ষমতা কোথায় এবং কীভাবে বণ্টিত হয়, তার ভিত্তিতে এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উভয় ব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রাষ্ট্রের আয়তন, জনগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী এগুলোর কার্যকারিতা ভিন্ন হয়।
এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের মধ্যে পার্থক্যসমূহ
১। ক্ষমতা বণ্টন: এককেন্দ্রিক সরকারে রাষ্ট্রের প্রধান ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রের দেওয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারে সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ভাগ করা থাকে এবং উভয় সরকার নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করে।
২। ক্ষমতার উৎস: এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার মূল উৎস কেন্দ্রীয় সরকার এবং কেন্দ্র চাইলে তা পরিবর্তন বা সীমিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্য উভয়ের ক্ষমতা সংবিধান থেকে আসে। তাই কোনো সরকার এককভাবে অন্য সরকারের সাংবিধানিক ক্ষমতা বাতিল করতে পারে না।
৩। সংবিধানের প্রকৃতি: এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের সংবিধান লিখিত বা অলিখিত এবং নমনীয় বা কঠোর হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে সাধারণত লিখিত ও কঠোর সংবিধান প্রয়োজন হয়। কারণ কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতার সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও সুরক্ষিত রাখার জন্য সাংবিধানিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
৪। সরকারের স্তর: এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারই মূল শাসনক্ষমতার অধিকারী এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান তার অধীন থেকে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য—দুই স্তরের সাংবিধানিক সরকার থাকে। উভয় সরকার নির্ধারিত বিষয়ে জনগণের ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।
৫। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন: এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে প্রদেশ বা অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল এবং সাধারণত সীমিত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যের স্বায়ত্তশাসন সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত। ফলে তারা শিক্ষা, প্রশাসন বা স্থানীয় বিষয়ে নিজস্ব আইন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়।
৬। আইন প্রণয়ন: এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় আইনসভাই দেশের প্রধান আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় আইন সাধারণত কেন্দ্রীয় আইনের অধীন। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের পৃথক আইনসভা থাকে। উভয় আইনসভা সংবিধানে নির্ধারিত নিজ নিজ বিষয়ের ওপর আইন প্রণয়ন করতে পারে।
৭। বিচারিক ভূমিকা: এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে কেন্দ্র ও অঞ্চলের মধ্যে সাংবিধানিক ক্ষমতার বিরোধ তুলনামূলক কম দেখা যায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ হতে পারে। এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্বাধীন সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৮। সিদ্ধান্ত গ্রহণ: এককেন্দ্রিক সরকারে ক্ষমতা একটি কেন্দ্রে থাকায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তুলনামূলক দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ ও ক্ষমতা বিবেচনা করতে হয়। ফলে অনেক সিদ্ধান্তে আলোচনা, সমন্বয় ও সমঝোতার প্রয়োজন হওয়ায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা ধীর হতে পারে।
এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের সুবিধা-অসুবিধা
৯। দ্রুত সিদ্ধান্ত: এককেন্দ্রিক সরকারের বড় সুবিধা হলো দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। কেন্দ্রীয় সরকারকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সম্মতি নিতে হয় না বলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যুদ্ধ, দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটে এই বৈশিষ্ট্য কার্যকর প্রশাসন পরিচালনা এবং দ্রুত সমস্যা সমাধানে বিশেষ সহায়ক হয়।
১০। প্রশাসনিক ঐক্য: এককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সারা দেশে একই নীতি ও প্রশাসনিক নিয়ম প্রয়োগ করা সহজ। এতে কেন্দ্র ও অঞ্চলের মধ্যে নীতিগত বিরোধ কম থাকে এবং প্রশাসনিক সমন্বয় বজায় থাকে। একই ধরনের আইন ও ব্যবস্থা জাতীয় ঐক্য শক্তিশালী করে এবং সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হয়।
১১। ব্যয় সাশ্রয়: এককেন্দ্রিক সরকারে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের পৃথক আইনসভা ও প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন কম থাকে। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় তুলনামূলক কম হয়। ছোট ও কম জনসংখ্যার রাষ্ট্রে এই ব্যবস্থা প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে।
১২। কেন্দ্রীয় আধিপত্য: এককেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রধান অসুবিধা হলো কেন্দ্রীয় সরকারের অতিরিক্ত ক্ষমতা। কেন্দ্র স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও মতামত উপেক্ষা করলে প্রশাসনে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ স্বায়ত্তশাসন দুর্বল করতে পারে এবং বড় বা বৈচিত্র্যপূর্ণ রাষ্ট্রে আঞ্চলিক অসন্তোষ ও বঞ্চনার অনুভূতি বাড়াতে পারে।
১৩। স্থানীয় অবহেলা: কেন্দ্রীয় সরকার দেশের সব অঞ্চলের স্থানীয় সমস্যা সমানভাবে বুঝতে নাও পারে। ফলে দূরবর্তী এলাকার প্রয়োজন, সংস্কৃতি বা বিশেষ পরিস্থিতি উপেক্ষিত হতে পারে। অতিরিক্ত কেন্দ্রনির্ভরতা স্থানীয় নেতৃত্ব ও উদ্যোগকে দুর্বল করে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়।
১৪। স্বায়ত্তশাসনের সুবিধা: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের বড় সুবিধা হলো অঙ্গরাজ্যগুলো নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধান হওয়ায় প্রশাসন জনগণের কাছাকাছি থাকে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষা করা সম্ভব হয়।
১৫। ক্ষমতার ভারসাম্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ভাগ থাকায় একক সরকারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ কম। এই ব্যবস্থা স্বৈরাচারের আশঙ্কা হ্রাস করে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। পাশাপাশি জনগণ জাতীয় ও আঞ্চলিক—উভয় পর্যায়ে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
১৬। প্রশাসনিক জটিলতা: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দুই স্তরের সরকার থাকায় অনেক সময় একই বিষয়ে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। আইন, কর বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় বেশি লাগে এবং সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় অতিরিক্ত সমন্বয় ও প্রশাসনিক ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
১৭। কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধ: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের অন্যতম অসুবিধা হলো কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ে বিরোধের সম্ভাবনা। কোনো পক্ষ নিজের ক্ষমতা বাড়াতে চাইলে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ জাতীয় নীতি বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যও দুর্বল করতে পারে।
উপসংহার: এককেন্দ্রিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় উভয় সরকারব্যবস্থারই বিশেষ সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা দ্রুত সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক ঐক্যে কার্যকর, আর যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও বৈচিত্র্য রক্ষায় উপযোগী। তাই কোনো ব্যবস্থাই সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ নয়। রাষ্ট্রের আয়তন, ইতিহাস, জনগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা নির্ধারিত হয়।