- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কে. সি. হুইয়ার বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার কদাচিত দেখা যায়, কারণ এর পূর্বশর্ত অনেক।” অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক ঐক্য, আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ও পারস্পরিক আস্থাসহ বহু অনুকূল শর্ত একসঙ্গে থাকা প্রয়োজন।
১। ঐক্যের আকাঙ্ক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গঠনের প্রথম শর্ত হলো বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের মধ্যে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় ঐক্যে আবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা থাকা। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষায় তারা ঐক্যবদ্ধ হতে চাইলেও নিজেদের আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য সম্পূর্ণ ত্যাগ করতে চায় না।
২। স্বাতন্ত্র্য রক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী অঞ্চলগুলোকে জাতীয় ঐক্যের পাশাপাশি নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, প্রশাসন ও স্থানীয় স্বার্থ রক্ষার আকাঙ্ক্ষা রাখতে হয়। যদি তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে চায় বা সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত হতে চায়, তবে প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার গড়ে ওঠে না।
৩। ভৌগোলিক নৈকট্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র গঠনের জন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর ভৌগোলিকভাবে কাছাকাছি অবস্থান সুবিধাজনক। বিচ্ছিন্ন ও দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, প্রশাসনিক সমন্বয় ও অভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিচালনা কঠিন হয়। তাই একটি সংযুক্ত বা কাছাকাছি ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত।
৪। অভিন্ন স্বার্থ: অংশগ্রহণকারী অঞ্চলগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো কিছু অভিন্ন স্বার্থ থাকা প্রয়োজন। এসব স্বার্থ তাদের একত্রে কাজ করতে উৎসাহিত করে। সাধারণ স্বার্থের অভাব থাকলে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ঐক্য বজায় রাখা কঠিন হয়।
৫। আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সাধারণত এমন রাষ্ট্রে প্রয়োজন হয়, যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস বা আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে এই বৈচিত্র্য এত গভীর হওয়া চলবে না যাতে পারস্পরিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। বৈচিত্র্য ও ঐক্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকাই এর গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
৬। রাজনৈতিক পরিপক্বতা: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার সফল করতে জনগণ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে গণতান্ত্রিক মনোভাব, সহনশীলতা এবং সমঝোতার সংস্কৃতি থাকতে হয়। কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে মতবিরোধ স্বাভাবিক; কিন্তু তা শান্তিপূর্ণ সাংবিধানিক পদ্ধতিতে সমাধানের রাজনৈতিক পরিপক্বতা না থাকলে ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
৭। পারস্পরিক আস্থা: কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ক্ষমতা দখল করবে—এমন ভয় থাকলে সহযোগিতা দুর্বল হয়। সাংবিধানিক সীমা ও পারস্পরিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেই ফেডারেল কাঠামো স্থায়ী হতে পারে।
৮। লিখিত সংবিধান: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের ক্ষমতার বণ্টন স্পষ্ট রাখার জন্য সাধারণত একটি লিখিত সংবিধান প্রয়োজন। এতে কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং সম্পর্ক নির্ধারিত থাকে। লিখিত বিধান না থাকলে এখতিয়ার নিয়ে বিরোধ বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৯। কঠোর সংবিধান: যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে সংবিধান এমন হতে হয় যাতে কেন্দ্র বা অঙ্গরাজ্য এককভাবে সহজে তা পরিবর্তন করতে না পারে। বিশেষ সংশোধন পদ্ধতি অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাকে সুরক্ষা দেয়। এতে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অতিরিক্ত বিস্তার রোধ হয় এবং ক্ষমতার সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
১০। ক্ষমতা বিভাজন: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত হলো কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা স্পষ্টভাবে বিভক্ত থাকা। প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রার মতো বিষয় কেন্দ্রের এবং স্থানীয় প্রশাসনের কিছু বিষয় অঙ্গরাজ্যের অধীনে থাকে। অস্পষ্ট বণ্টন ঘনঘন বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
১১। সংবিধানের প্রাধান্য: যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সংবিধানকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে মানতে হয়। কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্য উভয় সরকারই সংবিধানের অধীন থাকে। কোনো পক্ষ সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করলে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকতে হয়। এই নীতি ছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা কঠিন।
১২। স্বাধীন বিচারব্যবস্থা: কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে বিরোধ হলে নিরপেক্ষভাবে তা নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রয়োজন। সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে বিরোধ মীমাংসা করে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকলে কেন্দ্রীয় আধিপত্য বা আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে পারে।
১৩। অর্থনৈতিক সামর্থ্য: কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্য উভয়ের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সামর্থ্য থাকতে হয়। অঙ্গরাজ্য সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হলে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর আর্থিক বণ্টন অপরিহার্য।
১৪। প্রশাসনিক দক্ষতা: দুই স্তরের সরকার পরিচালনায় দক্ষ প্রশাসন, স্পষ্ট দায়িত্ব ও নিয়মিত সমন্বয় প্রয়োজন। কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে একই কাজের পুনরাবৃত্তি, বিরোধ এবং অপচয় সৃষ্টি হয়। তাই কার্যকর যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য উচ্চমানের প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকা আবশ্যক।
১৫। গণতান্ত্রিক পরিবেশ: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার সাধারণত গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভালোভাবে কাজ করে। জনগণের অংশগ্রহণ, নির্বাচিত সরকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন কেন্দ্র ও অঙ্গরাজ্যের স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করে। স্বৈরাচারী প্রবণতা শক্তিশালী হলে ক্ষমতা কেন্দ্রে জমা হয়ে ফেডারেল চরিত্র দুর্বল হতে পারে।
১৬। দ্বিকক্ষ আইনসভা: অধিকাংশ যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যের স্বার্থ রক্ষার জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত একটি কক্ষ জনগণের এবং অন্যটি অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে। এতে কেন্দ্রীয় আইন প্রণয়নের সময় আঞ্চলিক স্বার্থের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
১৭। শর্তের সমন্বয়: যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য উপরোক্ত সব শর্তের মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু ভৌগোলিক নৈকট্য বা লিখিত সংবিধান থাকলেই যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য, গণতন্ত্র ও পারস্পরিক আস্থা একসঙ্গে না থাকলে ব্যবস্থা সফল হয় না।
উপসংহার: কে. সি. হুইয়ারের উক্তিটি যথার্থ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠা ও সফলভাবে পরিচালনার জন্য অসংখ্য রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক পূর্বশর্ত প্রয়োজন। এসব শর্ত একই রাষ্ট্রে একসঙ্গে পাওয়া কঠিন বলেই যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার তুলনামূলকভাবে কদাচিৎ দেখা যায়।