- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা:
জার্মান-ইতালীয় সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মিশেলস রাজনৈতিক দলের সংগঠন ও নেতৃত্ব বিশ্লেষণ করে দেখান যে বৃহৎ রাজনৈতিক দল ধীরে ধীরে অল্পসংখ্যক নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাঁর পার্টি তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধি’ বা Iron Law of Oligarchy।
রবার্ট মিশেলের পার্টি তত্ত্ব আলোচনা:
১। সংগঠনের প্রয়োজন: মিশেলসের মতে, বৃহৎ রাজনৈতিক দল পরিচালনার জন্য সংগঠন অপরিহার্য। বিপুলসংখ্যক সদস্য সরাসরি প্রতিটি সিদ্ধান্তে অংশ নিতে পারে না। তাই কাজের সুবিধার্থে দায়িত্ব কিছু নেতা ও কর্মকর্তার হাতে অর্পিত হয় এবং এখান থেকেই নেতৃত্বের বিশেষ ক্ষমতা তৈরি হতে শুরু করে।
২। গোষ্ঠীতন্ত্রের উদ্ভব: রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের সঙ্গে অল্পসংখ্যক নেতা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। সাধারণ সদস্যের ভূমিকা কমে যায় এবং একটি প্রভাবশালী নেতৃত্বগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। মিশেলস এই প্রবণতাকেই গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
৩। লৌহবিধি: মিশেলসের বিখ্যাত বক্তব্য হলো, “Who says organization, says oligarchy.” অর্থাৎ সংগঠন সৃষ্টি হলেই গোষ্ঠীতন্ত্রের প্রবণতা জন্ম নেয়। সংগঠন যত বড় ও জটিল হয়, ততই সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা অল্পসংখ্যক পেশাদার নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
৪। নেতৃত্বের প্রয়োজন: দলের কার্যক্রম পরিচালনা, নির্বাচন, প্রচার ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার। সাধারণ সদস্যদের সবার পক্ষে এসব কাজে সমান দক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। ফলে নেতাদের ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে তাদের ক্ষমতাকে শক্তিশালী ও স্থায়ী করে তোলে।
৫। পেশাদার নেতৃত্ব: দীর্ঘদিন রাজনীতিতে সক্রিয় নেতারা বক্তৃতা, সংগঠন, প্রশাসন ও আলোচনায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। তারা ধীরে ধীরে পেশাদার রাজনৈতিক শ্রেণিতে পরিণত হন। সাধারণ সদস্যদের তুলনায় তাদের অভিজ্ঞতা বেশি হওয়ায় দলীয় সিদ্ধান্তে তাদের কর্তৃত্বও ক্রমে বাড়তে থাকে।
৬। তথ্যের আধিপত্য: শীর্ষ নেতারা দলের নীতি, অর্থ, সদস্য, যোগাযোগ ও গোপন কৌশল সম্পর্কে বেশি তথ্য রাখেন। সাধারণ সদস্যরা একই পরিমাণ তথ্য পায় না। ফলে তথ্যের অসমতা নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে এবং সদস্যদের পক্ষে তাদের সিদ্ধান্তকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৭। সদস্যের নিষ্ক্রিয়তা: মিশেলস মনে করেন, অধিকাংশ সাধারণ সদস্য সবসময় সক্রিয়ভাবে দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না। সময়, দক্ষতা ও আগ্রহের অভাবে তারা নেতাদের ওপর নির্ভর করে। এই নিষ্ক্রিয়তা নেতৃত্বকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয় এবং গোষ্ঠীতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়।
৮। নেতার মর্যাদা: দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা জনপ্রিয়তা, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক প্রভাব অর্জন করেন। কর্মীরা তাদের প্রতি আনুগত্য ও শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করে। এতে নেতার ব্যক্তিগত মর্যাদা এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে তাকে সরানো বা তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
৯। আমলাতান্ত্রিক কাঠামো: বড় রাজনৈতিক দল পরিচালনায় স্থায়ী দপ্তর, কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। এই আমলাতান্ত্রিক কাঠামো সাধারণ সদস্যের তুলনায় নেতৃত্বকে বেশি সুবিধা দেয়। ফলে দলীয় প্রশাসন ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র শক্তিতে পরিণত হয় এবং সিদ্ধান্তে সাধারণ সদস্যের অংশগ্রহণ কমে যায়।
১০। অর্থের নিয়ন্ত্রণ: দলের তহবিল, অনুদান ও নির্বাচনী ব্যয় সাধারণত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থনৈতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেতাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়ায়। অর্থের মাধ্যমে প্রার্থী, কর্মসূচি ও দলীয় কর্মকাণ্ড প্রভাবিত করা সম্ভব হওয়ায় নেতৃত্বের আধিপত্য আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
১১। প্রার্থী মনোনয়ন: নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষমতা শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে থাকলে নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও পদ লাভ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ভিন্নমত প্রকাশের সাহস কমে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়।
১২। স্বার্থের পরিবর্তন: মিশেলসের মতে, নেতারা শুরুতে সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করলেও পরে নিজেদের পদ, মর্যাদা ও ক্ষমতা রক্ষায় বেশি আগ্রহী হতে পারেন। তখন নেতৃত্বের ব্যক্তিগত স্বার্থ ও দলের সাধারণ সদস্যদের স্বার্থের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
১৩। বিরোধ নিয়ন্ত্রণ: প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্ব দলীয় নিয়ম ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বিরোধী গোষ্ঠীর প্রভাব কমাতে পারে। পদ না দেওয়া, প্রার্থী না করা বা সাংগঠনিক শাস্তির মাধ্যমে বিরোধিতা সীমিত করা সম্ভব। এতে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং শীর্ষ গোষ্ঠীর আধিপত্য টিকে থাকে।
১৪। গণতন্ত্রের সীমা: রাজনৈতিক দল বাইরে গণতন্ত্রের পক্ষে কথা বললেও নিজেদের ভেতরে সবসময় পূর্ণ গণতন্ত্র বজায় রাখতে পারে না। সাংগঠনিক প্রয়োজন, নেতৃত্বের দক্ষতা ও সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। তাই মিশেলস গণতন্ত্রের বাস্তব সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন।
১৫। শ্রমিক দলের উদাহরণ: মিশেলস বিশেষভাবে সমাজতান্ত্রিক ও শ্রমিক দল পর্যবেক্ষণ করে তাঁর তত্ত্ব গড়ে তোলেন। তিনি দেখেন, সমতা ও গণতন্ত্রের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত দলও একসময় পেশাদার নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর গোষ্ঠীতন্ত্রের লৌহবিধিকে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
১৬। তত্ত্বের সমালোচনা: মিশেলসের তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। নিয়মিত নির্বাচন, স্বচ্ছতা, নেতৃত্ব পরিবর্তন, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্রিয় সদস্য অংশগ্রহণ থাকলে নেতাদের অতিরিক্ত আধিপত্য কমানো যায়। তাই গোষ্ঠীতন্ত্র শক্তিশালী প্রবণতা হলেও সম্পূর্ণ অনিবার্য নয়।
১৭। সামগ্রিক মূল্যায়ন: রবার্ট মিশেলসের পার্টি তত্ত্ব মূলত দেখায় যে রাজনৈতিক সংগঠনের বৃদ্ধি নেতৃত্বের কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। সংগঠন পরিচালনার প্রয়োজন, পেশাদার নেতৃত্ব, তথ্য ও অর্থের নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা মিলেই অল্পসংখ্যক নেতার হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা সৃষ্টি করে।
উপসংহার: রবার্ট মিশেলসের পার্টি তত্ত্ব রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বাস্তব চরিত্র বুঝতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, গণতান্ত্রিক সংগঠনও ধীরে ধীরে গোষ্ঠীতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। তবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে এই প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।