- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই আন্দোলনের পেছনে ছাত্রসমাজের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসন, রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক শোষণ ও শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যার বিরুদ্ধে ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে এবং ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “ছাত্র” বলতে শিক্ষার্থীদের বোঝায়, “সংগ্রাম” অর্থ কোনো দাবি বা অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন এবং “পরিষদ” অর্থ সংগঠন বা সমিতি। আর “১১ দফা কর্মসূচি” বলতে ১১টি নির্দিষ্ট দাবি ও কর্মপরিকল্পনার সমষ্টিকে বোঝায়।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচি: ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচি ছিল ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ কর্তৃক ঘোষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবি-সম্বলিত কর্মসূচি। এটি মূলত ১৯৬৬ সালের ছয় দফা কর্মসূচির সঙ্গে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবি যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এটি আইয়ুব খান সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করে এবং পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচির মূল বিষয়সমূহ:
১। শিক্ষার অধিকার: ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষার ব্যয় কমানো এবং ছাত্রদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
২। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন অসংগতি দূর করে আধুনিক ও গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি করা হয়। ছাত্রদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষা নীতি প্রণয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
৩। গণতান্ত্রিক অধিকার: ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ জনগণের মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করাই ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
৪। ছয় দফার সমর্থন: ১১ দফা কর্মসূচিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানানো হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা হয়।
৫। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের দাবি করা হয়। কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৬। শ্রমিকের অধিকার: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা এবং শ্রমিক স্বার্থ রক্ষার দাবি জানানো হয়। শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি ১১ দফায় গুরুত্ব পায়।
৭। কৃষকের অধিকার: কৃষকদের ওপর শোষণ বন্ধ, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করা হয়।
৮। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন: আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল ১১ দফা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয়। এটি স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনকে তীব্র করে তোলে।
৯। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি: রাজনৈতিক কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং দমনমূলক আইন বাতিলের দাবি জানানো হয়। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
১০। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি করা হয়। কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
১১। জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা: ১১ দফার মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এর মাধ্যমে বাঙালির জাতীয় চেতনা ও ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার গুরুত্ব:
১। গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি: ১১ দফা কর্মসূচি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২। রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি: এই কর্মসূচি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে উৎসাহিত করে।
৩। স্বাধীনতার পথ তৈরি: ১১ দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করে।
উপসংহার: ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু ছাত্রদের দাবি নয়, বরং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম।