- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর ঘটনা। এই দিনে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য সামরিক বাহিনীর একদল সদস্যের হাতে নিহত হন। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “অভ্যুত্থান” শব্দের অর্থ হলো বিদ্যমান ক্ষমতা বা শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আকস্মিক বিদ্রোহ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা। তাই ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান বলতে বোঝায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত সেই সামরিক বিদ্রোহ, যার মাধ্যমে তৎকালীন সরকার উৎখাত করা হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কয়েকজন বিপথগামী সদস্য সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাসভবনে হত্যা করে। একই ঘটনায় তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পটভূমি:
১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যার কারণে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তীতে অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করে।
২। অর্থনৈতিক সংকট: স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, খাদ্য সংকট, দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। সরকার অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করলেও বিরোধী মহল এসব বিষয়কে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
৩। বাকশাল প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়। একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্তকে অনেক রাজনৈতিক দল ও মহল বিরোধিতা করে। এই বিষয়টি তৎকালীন রাজনৈতিক বিরোধের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
৪। সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ: সেনাবাহিনীর কিছু সদস্যের মধ্যে পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন ও বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এই অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে একদল সামরিক কর্মকর্তা সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা করে। তবে পুরো সেনাবাহিনী এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল না; এটি ছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ড।
১৫ আগস্টের ঘটনার বিবরণ:
১। সামরিক অভিযান: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে কয়েকটি সামরিক দল ট্যাংক ও অস্ত্র নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেয়। একটি দল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর হামলা চালায়। এই হামলায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।
২। বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের হত্যা: এই ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তাঁর তিন ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেলসহ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও মর্মান্তিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি।
৩। নতুন সরকার গঠন: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয় এবং দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনা:
১। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি: ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক সরকার Indemnity Ordinance জারি করে। এর মাধ্যমে ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পথ বন্ধ করা হয়।
২। রাজনৈতিক পরিবর্তন: ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে। সামরিক বাহিনীর প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক রাজনৈতিক ঘটনা দেশের শাসনব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
৩। বিচার প্রক্রিয়া: ১৯৯৬ সালে Indemnity অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি হয়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১। রাজনৈতিক ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা পরিবর্তিত হয় এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।
২। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব: এই ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। পরবর্তী কয়েক বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৩। জাতীয় জীবনে প্রভাব: ১৫ আগস্টের ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এটি জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিভিন্নভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়।
উপসংহার: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মর্মান্তিক ঘটনা। এই ঘটনার মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে এবং দীর্ঘদিন এর প্রভাব বিদ্যমান থাকে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে ১৫ আগস্টের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।