- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- ভূ-অর্থনীতি কী?
Or, ভূ-অর্থনীতি কাকে বলে?
Or, ভূ-অর্থনীতির সজ্ঞা দাও।
Or, ভূ-অর্থনীতি বলতে কী বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তি, সম্পদ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ভৌগোলিক অবস্থান ও রাজনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে ভূ-অর্থনীতির ধারণার বিকাশ ঘটেছে।
ভূ-অর্থনীতির পরিচয়:
ভূ-অর্থনীতি হলো এমন একটি ধারণা, যেখানে কোনো রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্যিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে জাতীয় স্বার্থ অর্জনের কৌশল গ্রহণ করে। এটি ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির সমন্বিত রূপ, যেখানে অর্থনৈতিক উপায়কে আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভূ-অর্থনীতির শাব্দিক অর্থ:
‘ভূ-অর্থনীতি’ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত— ‘ভূ’ অর্থ পৃথিবী বা ভৌগোলিক অবস্থান এবং ‘অর্থনীতি’ অর্থ সম্পদ উৎপাদন, বণ্টন, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত বিষয়। সুতরাং শাব্দিক অর্থে ভূ-অর্থনীতি বলতে ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ককে বোঝায়।
১। এডওয়ার্ড লুটওয়াক (Edward Luttwak):
এডওয়ার্ড লুটওয়াক ভূ-অর্থনীতির ধারণাকে আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে, সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করে। (Geoeconomics is the use of economic instruments to achieve geopolitical objectives in international competition.)
২। প্যাসকাল লরোট (Pascal Lorot):
প্যাসকাল লরোটের মতে, ভূ-অর্থনীতি হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। (Geoeconomics is the analysis of economic strategies used by states and organizations to achieve power and influence.)
৩। রবার্ট ব্ল্যাকউইল ও জেনিফার হ্যারিস (Robert D. Blackwill and Jennifer M. Harris):
তাদের মতে, ভূ-অর্থনীতি হলো জাতীয় স্বার্থ অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক উপকরণ ব্যবহার করার কৌশল। তারা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। (Geoeconomics is the use of economic tools to promote and defend national interests.)
৪। জোসেফ নাই (Joseph Nye):
জোসেফ নাই অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে একটি দেশের ‘সফট পাওয়ার’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক আকর্ষণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে পারে। (Geoeconomics involves using economic strength and attraction as sources of national power and influence.)
৫। জর্জ ফ্রিডম্যান (George Friedman):
জর্জ ফ্রিডম্যানের মতে, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ভৌগোলিক অবস্থান তার বৈশ্বিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পারে। (Geoeconomics is the relationship between economic power, geography, and strategic national interests.)
৬। ক্লাইভ হ্যামিল্টন (Clive Hamilton):
ক্লাইভ হ্যামিল্টন ভূ-অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার অর্থনৈতিক মাত্রা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, বিশ্ব রাজনীতিতে অর্থনৈতিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপায়। (Geoeconomics refers to the economic dimensions of global power and strategic competition among states.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, ভূ-অর্থনীতি হলো এমন একটি কৌশলগত ধারণা, যেখানে রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সুবিধা, অর্থনৈতিক শক্তি, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রভাব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে।
উপসংহার: ভূ-অর্থনীতি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অর্থনৈতিক শক্তি, বাণিজ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। তাই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাষ্ট্রের কৌশল, ক্ষমতার ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য ভূ-অর্থনীতির গুরুত্ব অপরিসীম।