- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করে তার বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে হওয়ায় পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ যে নীতি গ্রহণ করেছে তাকে পূর্বমুখী নীতি বলা হয়।
বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতির পরিচয়:-
পূর্বমুখী নীতি: পূর্বমুখী নীতি শব্দটি ইংরেজি “Look East Policy” শব্দের বাংলা রূপ। “Look” অর্থ হলো তাকানো বা গুরুত্ব দেওয়া, “East” অর্থ হলো পূর্ব দিক বা পূর্বাঞ্চল এবং “Policy” অর্থ হলো নীতি বা পরিকল্পনা। অর্থাৎ পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত নীতিকে পূর্বমুখী নীতি বলা হয়।
বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতি (Look East Policy/Act East Policy) হলো এমন একটি পররাষ্ট্রনৈতিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করে। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, আসিয়ানভুক্ত দেশ এবং অন্যান্য পূর্বাঞ্চলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করা।
বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:-
১। অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করা হয়।
২। বাণিজ্য সম্প্রসারণ: পূর্বমুখী নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চায়। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, আমদানি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
৩। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ: বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পূর্বমুখী নীতির মাধ্যমে জাপান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়, যা শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করে।
৪। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি: বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সংযোগ বৃদ্ধি করা। সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
৫। আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন: পূর্বমুখী নীতিতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।
৬। কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধি: পূর্বমুখী নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ পূর্বাঞ্চলীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। এর মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়।
৭। প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময়: পূর্বমুখী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য রয়েছে।
৮। সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি: বাংলাদেশ পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পর্যটনের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা এই নীতির একটি অংশ।
উপসংহার: বাংলাদেশের পূর্বমুখী নীতি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে বাংলাদেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে পূর্বমুখী নীতির গুরুত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।