- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “নির্বাচন” শব্দের অর্থ হলো প্রতিনিধি বাছাই করার প্রক্রিয়া এবং “কমিশন” শব্দের অর্থ হলো নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান। তাই নির্বাচন কমিশনের শাব্দিক অর্থ হলো নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন হলো একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যা দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা, ভোটার তালিকা প্রস্তুত এবং নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের গঠন:
১। সাংবিধানিক ভিত্তি: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রতিষ্ঠিত। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যাতে এটি নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যক্রম সংবিধান ও সংশ্লিষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়।
২। প্রধান নির্বাচন কমিশনার: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের প্রধান হলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (Chief Election Commissioner)। রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করেন। তিনি কমিশনের নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
৩। নির্বাচন কমিশনারগণ: প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে এক বা একাধিক নির্বাচন কমিশনার নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। কমিশনারদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতি প্রদান করেন। তারা নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতি নির্ধারণ এবং কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সহযোগিতা করেন।
৪। নিয়োগ পদ্ধতি: বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ দেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি আইনগত কাঠামো রয়েছে, যার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করে কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৫। মেয়াদকাল: নির্বাচন কমিশনারদের মেয়াদ সংবিধান ও আইন দ্বারা নির্ধারিত। সাধারণভাবে একজন নির্বাচন কমিশনার দায়িত্ব গ্রহণের পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। মেয়াদকালে তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
৬। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা: বাংলাদেশের সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা প্রদান করেছে। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। এর মাধ্যমে কমিশনের কার্যক্রমে সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়।
৭। সচিবালয় ও প্রশাসনিক কাঠামো: নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব সচিবালয় রয়েছে, যা কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। মাঠ পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োজিত থাকেন। এর মাধ্যমে সারাদেশে নির্বাচন পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।
৮। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব: নির্বাচন কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনা করা। এছাড়া ভোটার তালিকা তৈরি ও সংশোধন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন এবং নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়ন করাও কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৯। নির্বাচন কমিশনের আর্থিক ব্যবস্থা: নির্বাচন কমিশনের ব্যয় রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে পরিচালিত হয়। আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম অনুসরণ করে কমিশনের অর্থ পরিচালিত হয়।
১০। নির্বাচন কমিশনের গুরুত্ব: একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কমিশন জনগণের ভোটাধিকার রক্ষা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
উপসংহার: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এটি জনগণের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় ভূমিকা পালন করে। একটি কার্যকর নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।