- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত শান্তি, পারস্পরিক সহযোগিতা, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি- এর শাব্দিক অর্থ:- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শব্দটি ইংরেজি “Foreign Policy of Bangladesh” শব্দের বাংলা রূপ। “Foreign” অর্থ হলো বিদেশি বা বৈদেশিক এবং “Policy” অর্থ হলো নীতি বা পরিকল্পনা। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ যে নীতি গ্রহণ করে তাকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বলা হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান, লক্ষ্য ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গৃহীত নীতিমালা। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, সংহতি ও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো—“সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:-
১। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট শক্তির বিরোধিতা না করে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে। এই নীতি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
২। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি গুরুত্ব দেয়। অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি না করে আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের নীতি অনুসরণ করে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাত এড়িয়ে চলা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
৩। সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান: বাংলাদেশ অন্য রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করে। একইভাবে বাংলাদেশও নিজের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্ব দেয়। অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪। আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালার প্রতি আস্থা রাখে। আন্তর্জাতিক বিরোধ ও সমস্যা সমাধানে আইনভিত্তিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে বাংলাদেশ অবস্থান গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা পালন করে।
৫। জাতিসংঘের প্রতি আস্থা: বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও এর বিভিন্ন কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেয়। আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা, মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন কার্যক্রম ও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে। জাতিসংঘের মাধ্যমে বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধিকে বাংলাদেশ সমর্থন করে।
৬। জোট নিরপেক্ষতা: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জোট নিরপেক্ষতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটের অংশ না হয়ে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করার চেষ্টা করে। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই এর লক্ষ্য।
৭। অর্থনৈতিক কূটনীতি: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
৮। আঞ্চলিক সহযোগিতা: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখে। সার্ক, বিমসটেকসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে কাজ করে।
৯। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ: বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রাখছে।
১০। মানবাধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ: বাংলাদেশ মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। শরণার্থী সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে।
উপসংহার: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শান্তি, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাংলাদেশ বিশ্ব অঙ্গনে তার ভূমিকা পালন করে আসছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।