- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- Indemnity অধ্যাদেশ কী?
Or, Indemnity অধ্যাদেশ কাক বলে?
Or, Indemnity অধ্যাদেশ সম্পর্কে কি জান?
Or, Indemnity অধ্যাদেশ সম্পর্কে যা জান লিখ।
উত্তর::ভূমিকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে Indemnity অধ্যাদেশ একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত আইনগত বিষয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পথ বন্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি বাংলাদেশের বিচার ও আইনের শাসনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়।
Indemnity অধ্যাদেশের পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “Indemnity” শব্দের অর্থ হলো ক্ষতিপূরণ, দায়মুক্তি বা কোনো আইনগত দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান। “অধ্যাদেশ” হলো এমন একটি আইন, যা সংসদ অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ জারি করতে পারেন। তাই Indemnity অধ্যাদেশের শাব্দিক অর্থ হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের জন্য আইনগত দায় থেকে রক্ষা করার জন্য জারি করা বিশেষ আইন।
Indemnity অধ্যাদেশ: Indemnity অধ্যাদেশ ছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার কর্তৃক জারি করা একটি আইনগত ব্যবস্থা। এর পূর্ণ নাম ছিল “The Indemnity Ordinance, 1975”। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।
Indemnity অধ্যাদেশের পটভূমি:
১। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য সামরিক বাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রে একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে।
২। রাজনৈতিক পরিবর্তন: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। নতুন সরকার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য Indemnity অধ্যাদেশ জারি করে।
৩। বিচার বন্ধের ব্যবস্থা: এই অধ্যাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো মামলা দায়ের, তদন্ত বা বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখা। এর ফলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আইনি বিচারের বাইরে থাকে।
Indemnity অধ্যাদেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য:
১। দায়মুক্তি প্রদান: Indemnity অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনগত দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছিল।
২। বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাধা: এই অধ্যাদেশের কারণে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সাধারণ আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের ও বিচার পরিচালনার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার ও রাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে।
৩। সাংবিধানিক সুরক্ষা: পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে সামরিক শাসনামলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে অধ্যাদেশটি দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে।
৪। আইনের শাসনের প্রশ্ন: Indemnity অধ্যাদেশ নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল এটি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। সমালোচকদের মতে, কোনো অপরাধের বিচার বন্ধ করার ব্যবস্থা বিচার ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
Indemnity অধ্যাদেশ বাতিল:
১। বাতিলের উদ্যোগ: ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে Indemnity অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
২। বাতিল আইন: ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর জাতীয় সংসদে Indemnity (Repeal) Act, 1996 পাস করা হয়। এর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল হয় এবং হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৩। বিচার কার্যক্রম শুরু: অধ্যাদেশ বাতিলের পর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে যায়। পরবর্তীতে আদালতের রায়ের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়।
Indemnity অধ্যাদেশের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
১। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রভাব: Indemnity অধ্যাদেশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্পর্ককে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
২। আইনের শাসনের আলোচনা: এই অধ্যাদেশ আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অপরাধের বিচারের অধিকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। এটি রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে।
৩। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিষয়: Indemnity অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের গুরুত্ব তুলে ধরে।
উপসংহার: Indemnity অধ্যাদেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়। এটি ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত করেছিল। পরবর্তীতে অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়ার পথ উন্মুক্ত হয় এবং রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।