- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি সমাজের চালিকাশক্তি আসলে কী? কার্ল মার্ক্স থেকে শুরু করে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, অর্থনীতির ভেতরের শক্তিই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে। সহজ কথায়, কার পকেটে কত টাকা আছে এবং উৎপাদন ব্যবস্থার চাবিকাঠি কার হাতে, তার ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা কার হাতে থাকবে।
১। সম্পদের মালিকানা: সমাজে উৎপাদন উপায়ের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ থাকে, রাষ্ট্রক্ষমতা মূলত তার হাতেই আবর্তিত হয়। জমি, কলকারখানা বা প্রযুক্তির মালিকেরা তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার জন্য রাজনৈতিক দল এবং আইন তৈরি করে। ফলে সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রায়শই ধনীদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
২। শ্রেণি ব্যবস্থার সৃষ্টি: অর্থনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন সমাজে ধনী এবং দরিদ্র নামে দুটি প্রধান শ্রেণির জন্ম দেয়। এই অর্থনৈতিক বিভাজনই পরবর্তীতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শাসক ও শাসিত শ্রেণির জন্ম দেয়। ধনী শ্রেণি চিরকালই তাদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের এই সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যায়।
৩। আইন প্রণয়ন: রাষ্ট্র যে সমস্ত আইন তৈরি করে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় সেগুলো ধনীদের সম্পদ রক্ষার অনুকূল। কর নীতি, শ্রম আইন বা বাণিজ্যিক চুক্তিগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যেন পুঁজিপতিদের ব্যবসা সফল হয়। ফলে রাজনৈতিক কাঠামোটি প্রকারান্তরে অর্থনৈতিক শক্তিশালীদের একটি আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করে।
৪। নির্বাচনী রাজনীতি: আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন করতে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয় যা সাধারণ মানুষের সাধ্যে বাইরে। বড় বড় ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতিরা রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়ন করে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ক্ষমতায় বসায়। এর ফলে নির্বাচিত সরকার সাধারণ জনগণের চেয়ে ওই অর্থদাতাদের স্বার্থ রক্ষায় বেশি মনোযোগী হয়।
৫। আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্রের ওপর অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গভীর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বড় অংশই ধনী পরিবারের সন্তান অথবা তারা ধনকুবেরদের দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হন। ফলে নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পদক্ষেপে অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন পরিষ্কার দেখা যায়।
৬। গণমাধ্যমের ভূমিকা: সমাজের বড় বড় গণমাধ্যমগুলোর মালিকানা থাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে। তারা জনমতকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যা বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পক্ষে যায়। সাধারণ মানুষের বিপ্লবী বা পরিবর্তনকামী চিন্তাকে তারা কৌশলে প্রচার মাধ্যম থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
৭। শ্রমিক শোষণ: যখন অর্থনৈতিক ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হয়, তখন শ্রমিক শ্রেণি মজুরি নিয়ে দরকষাকষির ক্ষমতা হারায়। রাষ্ট্র তখন শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার চেয়ে কলকারখানার উৎপাদন সচল রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে রাজনৈতিক শক্তি সবসময়ই মালিকপক্ষের স্বার্থের অনুকূলে পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
৮। সামন্ততান্ত্রিক রাজনীতি: মধ্যযুগে বা সামন্ততান্ত্রিক সমাজে ভূমির মালিকানাই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। যার যত বেশি জমি ছিল, সমাজে তার রাজনৈতিক পদমর্যাদা এবং প্রভাব ততটাই বেশি ছিল। রাজা বা জমিদাররা তাদের এই অর্থনৈতিক প্রতিপত্তির ওপর ভর করেই পুরো শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন।
৯। পুঁজিবাদী শাসন: বর্তমান যুগে শিল্প ও প্রযুক্তির মালিকানা যাদের হাতে, তারাই শাসন ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখন এতটাই শক্তিশালী যে তারা সরকারের পতন ঘটাতে বা নীতি পরিবর্তন করতে পারে। পুঁজিবাদী এই অর্থনৈতিক শক্তিই মূলত আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশ্বিক রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
১০। নব্য-উপনিবেশবাদ: অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর রাজনীতি এখন উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক সাহায্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা ধনী দেশগুলো ঋণের শর্ত হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণ করে দেয়। অর্থনৈতিক এই পরাধীনতা প্রকারান্তরে একটি দেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।
১১। সুযোগের অসমতা: অর্থনৈতিক ক্ষমতার বৈষম্য সমাজে শিক্ষার সুযোগ এবং সচেতনতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রাচীর তৈরি করে। ধনী পরিবারের সন্তানেরা মানসম্মত শিক্ষা পেয়ে সহজেই রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসার সুযোগ পায়। অন্যদিকে দরিদ্ররা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় না।
১২। বিচার ব্যবস্থার পক্ষপাত: অর্থ যার আছে, আদালতে ভালো আইনজীবী নিয়োগ করে আইনকে নিজের পক্ষে নেওয়ার ক্ষমতা তার বেশি। রাজনৈতিক অপরাধে অনেক সময় ধনীদের ছাড় দেওয়া হলেও দরিদ্রদের ছোট অপরাধেও কঠোর শাস্তি পেতে হয়। বিচার ব্যবস্থার এই অদৃশ্য অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরো রাজনৈতিক কাঠামোকে কলুষিত ও একপেশে করে তোলে।
১৩। সামাজিক মর্যাদা: সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সফল ব্যক্তিদের আলাদা চোখে দেখা হয় এবং তাদের মতামতকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে তারা খুব সহজেই দেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে নিজেদের আসন পাকা করে নেয়। ফলে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের উচ্চমহল পর্যন্ত পৌঁছানোর কোনো সুযোগ থাকে না।
১৪। বিপ্লব ও পরিবর্তন: যখন সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম সীমায় পৌঁছায়, তখনই কেবল রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ঘটে। ফরাসি বিপ্লব বা রুশ বিপ্লবের পেছনের মূল কারণ ছিল তীব্র অর্থনৈতিক শোষণ ও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনই সামাজিকভাবে নতুন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
১৫। কল্যাণকামী রাষ্ট্র: যেসব দেশে সম্পদের বণ্টন তুলনামূলক সুষম, সেখানকার রাজনৈতিক কাঠামো অনেক বেশি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল হয়। যেমন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সমতা থাকার কারণে রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ এবং অধিকার অনেক বেশি। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকলে মানুষ স্বাধীনভাবে তাদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগ করার সাহস পায়।
১৬। কালো টাকার প্রভাব: অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা কালো টাকা একটি দেশের রাজনীতিকে পুরোপুরি জিম্মি করে ফেলতে পারে। এই টাকার জোরে অপরাধীরাও অনেক সময় সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়ে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন করে। তখন পুরো রাজনৈতিক কাঠামোটি জনকল্যাণের পথ ছেড়ে মাফিয়াতন্ত্রের রূপ ধারণ করতে বাধ্য হয়।
১৭। ভোগবাদী মানসিকতা: অর্থনৈতিক ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে, তারা সমাজে একটি তীব্র ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটায়। সাধারণ মানুষ তখন অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক লড়াই ভুলে গিয়ে বস্তুগত সুখের পেছনে অন্ধের মতো ছুটতে থাকে। এই সুযোগে শাসকরা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই তাদের শাসন ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ পেয়ে যায়।
১৮। প্রযুক্তিগত একচেটিয়াপত্র: বর্তমান যুগে যারা বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি বা ডেটা নিয়ন্ত্রণ করে, তারা মানুষের চিন্তাভাবনাকেও বদলে দিতে পারে। ফেসবুক বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বাচনের ফলাফল এবং জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখছে। এই নতুন অর্থনৈতিক শক্তিটি আগামী দিনের বৈশ্বিক রাজনীতির রূপরেখা একাই নির্ধারণ করছে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, অর্থনীতি হলো একটি সমাজের ভিত্তি আর রাজনীতি হলো তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠামো। অর্থনৈতিক ক্ষমতার সুষম বণ্টন ছাড়া কোনো সমাজেই প্রকৃত গণতন্ত্র বা রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাজনীতি কেবল ধনীদের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকবে।