- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মানবজীবনের অর্থ, উদ্দেশ্য এবং মুক্তি নিয়ে দর্শনের জগতে যে কয়টি মতবাদ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে অস্তিত্ববাদ অন্যতম। এই মতবাদ মানুষকে কোনো পূর্বনির্ধারিত ছকে না ফেলে তার নিজস্ব সত্তা ও স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধবিদ্ধস্ত পৃথিবীতে যখন মানুষ চরম হতাশায় ভুগছিল, তখনই এই দর্শনের জয়যাত্রা শুরু হয়।
১। ব্যক্তি স্বাধীনতা: অস্তিত্ববাদের মূল কথাই হলো মানুষের চরম ও পরম স্বাধীনতা। এখানে মানুষকে কোনো নিয়ম বা ভাগ্যের দাস হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। প্রতিটি মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্ত। এই দর্শন বিশ্বাস করে যে মানুষের ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের জীবনের একমাত্র চালক ও নিয়ন্তা।
২। অস্তিত্বের প্রাধান্য: এই দর্শনের প্রধান স্লোগান হলো মানুষের অস্তিত্ব তার সারবত্তার পূর্বে আসে। মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে জন্ম নেয়, উপস্থিত হয় এবং তারপর নিজের কর্ম দিয়ে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে। কোনো মানুষ জন্মগতভাবে ভালো বা মন্দ বা কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রের হয়ে পৃথিবীতে আসে না। নিজের পছন্দ ও কাজের মাধ্যমেই মানুষ তার আসল পরিচয় সমাজে তৈরি করে নেয়।
৩। একাকীত্ব বোধ: অস্তিত্ববাদী চিন্তাবিদদের মতে প্রতিটি মানুষ এই বিশাল মহাবিশ্বে সম্পূর্ণ একাকী ও নিঃসঙ্গ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে নিজের পথ নিজেকেই একাই পাড়ি দিতে হয়। অন্য কেউ এসে তার ভেতরের শূন্যতা বা একাকীত্ব দূর করতে পারে না। এই একাকীত্ব কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটিই মানুষের জীবনের এক নির্মম ও বাস্তব সত্য।
৪। গভীর angst বা উদ্বেগ: জীবনের চরম স্বাধীনতা মানুষের মনে এক ধরণের গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার জন্ম দেয়। যখন মানুষ বোঝে যে তার জীবনের সব সিদ্ধান্তের জন্য সে নিজেই দায়ী, তখন ভয় জাগে। এই মানসিক চাপ বা ভালো-মন্দের দোলাচলকে অস্তিত্ববাদে ‘অ্যাংস্ট’ বা অস্তিত্বের সংকট বলা হয়। এটি মানুষকে প্রতিনিয়ত তার নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক করে তোলে।
৫। ব্যক্তিগত দায়িত্ব: স্বাধীনতা যেমন আনন্দের, তেমনি এটি মানুষের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্বের বোঝাও চাপিয়ে দেয়। আপনার জীবনের যেকোনো ব্যর্থতা বা সফলতার জন্য অন্য কাউকে বা ভাগ্যকে দোষ দেওয়া যাবে না। প্রতিটি মানুষ তার নিজের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপের ফলাফলের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকে। এই দর্শন মানুষকে অজুহাত দেওয়া বন্ধ করে নিজের দায়িত্ব নিতে শেখায়।
৬। অর্থহীন মহাবিশ্ব: অস্তিত্ববাদ মনে করে এই মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো পূর্বনির্ধারিত অর্থ, লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নেই। পৃথিবীটা মানুষের যুক্তির বাইরে এক ধরণের চরম বিশৃঙ্খলা ও নিয়মহীনতায় ভরপুর। মানুষ নিজেই তার চিন্তা ও কর্মের মাধ্যমে এই অর্থহীন জীবনে অর্থ খুঁজে নেয়। মহাবিশ্ব আমাদের প্রতি উদাসীন, তাই নিজের জীবনের অর্থ আমাদের নিজেদেরই তৈরি করতে হয়।
৭। নিষ্ঠুর সত্য: এই দর্শন জীবনের রূঢ় ও বাস্তব সত্যকে কোনো রূপক ছাড়াই সরাসরি মেনে নিতে শেখায়। সমাজ বা ধর্মের তৈরি করা কাল্পনিক সান্ত্বনার আড়ালে অস্তিত্ববাদীরা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চান না। জীবনের দুঃখ, কষ্ট, মৃত্যু এবং অনিশ্চয়তাকে তারা সাহসের সাথে বরণ করে নেন। মিথ্যা আশার চেয়ে নিষ্ঠুর সত্যকে মেনে নেওয়াই এই দর্শনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
৮। মৃত্যুর চেতনা: মৃত্যুকে অস্তিত্ববাদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য বাস্তব উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়। মৃত্যু জীবনের শেষ সীমানা এবং এটি মানুষের সমস্ত অহংকার ও পরিকল্পনাকে মুহূর্তেই ধুলিসাৎ করে দেয়। মৃত্যুর এই অনিবার্য চেতনা মানুষকে বর্তমান সময়ের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব সহকারে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষ বুঝতে পারে যে তার হাতে সময় খুবই সীমিত ও মূল্যবান।
৯। যৌক্তিকতার অভাব: মানুষের জীবন ও এই জগত সবসময় চেনা ছকে বা যুক্তির নিয়মে চলে না। অনেক সময় জীবনের নানা ঘটনা যুক্তিহীন, অদ্ভুত এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মনে হয়। অস্তিত্ববাদীরা এই অযৌক্তিকতাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে সানন্দে মেনে নেন। তারা জগতকে জোর করে যুক্তির ফ্রেমে না বেঁধে তার আপন রূপে দেখতে চান।
১০। নিজস্ব নৈতিকতা: প্রচলিত সমাজ বা প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি মানুষের নৈতিকতা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। অস্তিত্ববাদে প্রতিটি মানুষ নিজের বিবেক ও অভিজ্ঞতার আলোকেই তার ভালো-মন্দের মানদণ্ড তৈরি করে। অন্যের চাপিয়ে দেওয়া নৈতিকতা অন্ধভাবে অনুসরণ করার মাঝে কোনো প্রকৃত মানবতা নেই। মানুষ যখন নিজের তৈরি নৈতিকতা মেনে চলে, তখনই সে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে।
১১। খাঁটি জীবনযাপন: অস্তিত্ববাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষকে একটি খাঁটি বা ‘অথেনটিক’ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করা। এর অর্থ হলো অন্যের অন্ধ অনুকরণ না করে নিজের ভেতরের সত্যকে প্রকাশ করা। মুখোশ পরে সমাজের চোখে ভালো হওয়ার চেয়ে নিজের বিশ্বাসের প্রতি সৎ থাকা জরুরি। ভণ্ডামি ত্যাগ করে নিজের আসল সত্তাকে প্রকাশ করাই হলো খাঁটি জীবন।
১২। অবিরাম কর্মতৎপরতা: নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে থাকার নাম অস্তিত্ববাদ নয়, বরং এটি কর্মের দর্শন। মানুষ কেবল ভাবনার মাধ্যমে নয়, বরং তার কাজের মাধ্যমেই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করে। হাত-পা গুটিয়ে ভাগ্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকলে জীবনের কোনো মূল্য থাকে না। প্রতিনিয়ত কর্মের মধ্যে ডুবে থেকে নিজেকে নতুন করে সৃষ্টি করাই মানুষের কাজ।
১৩। পছন্দের গুরুত্ব: মানুষের পুরো জীবনটাই আসলে অসংখ্য ছোট-বড় পছন্দের এক জটিল সমষ্টি মাত্র। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ আমাদের নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত বা পছন্দ বেছে নিতে হয়। এই পছন্দ করার ক্ষমতাই মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা ও শ্রেষ্ঠ করেছে। আমরা যা পছন্দ করি, দিনশেষে আমরা ঠিক সেই মানুষটিতেই রূপান্তরিত হয়ে যাই।
১৪। সমাজ সচেতনতা: ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হলেও অস্তিত্ববাদ মানুষকে সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ মনে করে না। মানুষের প্রতিটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও কাজ পরোক্ষভাবে সমাজের ওপর প্রভাব ফেলে। নিজের স্বাধীনতার চর্চা করার সময় অন্যের স্বাধীনতার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। তাই সমাজের প্রতি ব্যক্তির এক ধরণের গভীর ও অলিখিত দায়বদ্ধতা থেকেই যায়।
১৫। হতাশার মুখোমুখি: জীবনে চলার পথে হতাশা, ব্যর্থতা ও শূন্যতা আসবেই এবং একে অস্বীকার করার উপায় নেই। অস্তিত্ববাদ মানুষকে এই হতাশা থেকে পালিয়ে না গিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখায়। দুঃখ-কষ্টকে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিলেই কেবল তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। এই দর্শন মানুষকে চরম সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার এক অদ্ভুত মানসিক শক্তি জোগায়।
১৬। ধ্রুব সত্যের অস্বীকৃতি: এই জগত বা জীবনের কোনো একক, সার্বজনীন বা ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই। সত্য সবসময় আপেক্ষিক এবং তা ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। এক জনের কাছে যা পরম সত্য, অন্য জনের কাছে তা অর্থহীন হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট মতবাদকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরাকে অস্তিত্ববাদ সমর্থন করে না।
১৭। ঈশ্বরের ধারণা: অস্তিত্ববাদী চিন্তাবিদদের মধ্যে ঈশ্বর নিয়ে দুই ধরণের স্পষ্ট ও ভিন্ন মতবাদ দেখতে পাওয়া যায়। সার্ত্রে বা কামুর মতো নাস্তিক্যবাদী ধারা মনে করে ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে মানুষ চরম স্বাধীন। আবার কিয়ের্কেগার্ড বা মার্সেলের মতো আস্তিক্যবাদী ধারা ঈশ্বরের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে গুরুত্ব দেয়। উভয় ধারাই মানুষের ভেতরের আত্মিক অনুসন্ধানকে প্রধান মনে করে।
১৮। আত্ম-বিকাশের পথ: মানুষ কোনো সমাপ্ত বা পূর্ণাঙ্গ পণ্য নয়, সে প্রতিনিয়ত চলমান এক সম্ভাবনা। জন্মের পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মানুষের ভেতরের রূপান্তর ও বিকাশ চলতেই থাকে। প্রতিদিন নতুন অভিজ্ঞতা ও শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে নতুন ছাঁচে গড়ে তোলে। এই আত্ম-বিকাশ বা নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াই জীবনের আসল সৌন্দর্য।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, অস্তিত্ববাদ মানুষকে কোনো গণ্ডির মধ্যে বা শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে না। এটি মানুষকে নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক অদম্য সাহস জোগায়। জগত যতই অর্থহীন বা নিষ্ঠুর হোক না কেন, মানুষের ভেতরের ইচ্ছাশক্তিই পারে তাকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে। নিজের স্বাধীনতাকে সম্মান জানিয়ে বীরত্বের সাথে বেঁচে থাকার নামই হলো প্রকৃত অস্তিত্ববাদ।