- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: কার্ল কাউটস্কি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও জার্মান সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টির নেতা। মার্কস ও এঙ্গেলসের মৃত্যুর পর তিনি অর্থোডক্স মার্কসবাদের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং “মার্কসবাদের পোপ” উপাধিতে ভূষিত হন।
১। জন্ম ও শিক্ষা: কার্ল কাউটস্কি ১৮৫৪ সালের ১৬ অক্টোবর প্রাগে (বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্র) জন্মগ্রহণ করেন এবং ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি এক জার্মান-চেক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও দর্শনে আগ্রহী ছিলেন।
২। মার্কস ও এঙ্গেলসের সাথে সম্পর্ক: ১৮৮০-এর দশকে লন্ডনে নির্বাসিত থাকা কালে তিনি কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং মার্কসবাদী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। এঙ্গেলস তাঁকে মার্কসের অপ্রকাশিত রচনাগুলোর সম্পাদনার দায়িত্ব দেন।
৩। তাত্ত্বিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা: কাউটস্কি ১৮৮৩ সালে এঙ্গেলসের সহযোগিতায় “ডি নিউয়ে জাইট” নামক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পত্রিকা মার্কসবাদী তত্ত্বের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪। এরফুর্ট প্রোগ্রাম রচনা: ১৮৯১ সালে তিনি জার্মান সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টির বিখ্যাত “এরফুর্ট প্রোগ্রাম”-এর তাত্ত্বিক অংশটি রচনা করেন, যা মার্কসবাদের ওপর ভিত্তি করে পার্টির আনুষ্ঠানিক নীতিমালা নির্ধারণ করে। এই প্রোগ্রাম দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের সময় সামাজিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
৫। “মার্কসবাদের পোপ“: তাঁর প্রভাব এতটাই ব্যাপক ছিল যে তাঁকে “মার্কসবাদের পোপ” (Pope of Marxism) উপাধিতে ভূষিত করা হতো এবং দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের (১৮৮৯-১৯১৬) সময় তিনি মার্কসবাদের প্রধান তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। তাঁর রচনা ইউরোপের সব মার্কসবাদী দলে পঠিত হতো।
৬। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও বিরোধিতা: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় কাউটস্কি জার্মান সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টির যুদ্ধ সমর্থনের বিরোধিতা করেন এবং অধিকতর বামপন্থী স্বাধীন সামাজিক গণতান্ত্রিক পার্টি (ইউএসপিডি)-র সাথে যুক্ত হন। তিনি যুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত হিসেবে দেখতেন।
৭। লেনিনের সমালোচনা: তিনি বলশেভিক বিপ্লব ও লেনিনের সর্বহারার একনায়কত্ব তত্ত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। ১৯১৮ সালে তিনি “ডি ডিক্টাটুর ডেস প্রলেতারিয়াটস” (The Dictatorship of the Proletariat) নামক গ্রন্থে লেনিনের বিরুদ্ধে লেখেন এবং যুক্তি দেন যে গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমেই সমাজতন্ত্র অর্জন সম্ভব, সর্বহারার একনায়কত্বের মাধ্যমে নয়।
৮। লেনিনের প্রতিক্রিয়া: এই অবস্থানের কারণে লেনিন ও বলশেভিকরা তাঁকে “বিশ্বাসঘাতক” ও “সংশোধনবাদী” হিসেবে অভিহিত করেন। লেনিন “প্রলেতারিয়েত বিপ্লব ও রেনেগেড কাউটস্কি” নামক গ্রন্থে তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন এবং মার্কসবাদী আন্দোলন থেকে তাঁকে বহিষ্কারের আহ্বান জানান।
৯। মার্কসের রচনা সম্পাদনা: কাউটস্কি মার্কসের “থিওরি অফ সারপ্লাস ভ্যালু” (১৯০৫-১০) গ্রন্থটির সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যা মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি মার্কসের অপ্রকাশিত অনেক রচনা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন।
১০। গ্রন্থ রচনা: তিনি কৃষি প্রশ্ন, সাম্রাজ্যবাদ, ধর্ম ও সমাজতন্ত্র, এবং বিপ্লবের তত্ত্ব নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর “দি এগ্রারিয়ান কোয়েশ্চেন” (১৮৯৯) এবং “ইমপেরিয়ালিজম” (১৯১৪) গ্রন্থগুলো মার্কসবাদী তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
১১। নাৎসি নিপীড়ন: ১৯৩৩ সালে নাৎসিরা তাঁর বইগুলো মার্কসের বইয়ের সাথে পুড়িয়ে ফেলে, কিন্তু তিনি লেখা চালিয়ে যান। তিনি নাৎসি শাসনের তীব্র সমালোচনা করেন এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানান।
১২। মৃত্যু: ১৯৩৮ সালে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করার পর তিনি নেদারল্যান্ডসে চলে যান এবং আমস্টারডামে ১৯৩৮ সালের ১৭ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর মার্কসবাদী আন্দোলনে তাঁর প্রভাব কমতে থাকে।
১৩। জটিল উত্তরাধিকার: কার্ল কাউটস্কির উত্তরাধিকার জটিল—একদিকে তিনি মার্কসবাদের প্রধান প্রবক্তা ও জনপ্রিয়কারক ছিলেন, অন্যদিকে লেনিন ও মাওয়ের মতো বিপ্লবীরা তাঁকে সংশোধনবাদী হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তবু তিনি বিংশ শতাব্দীর মার্কসবাদী চিন্তাধারার ইতিহাসে এক অনন্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে থেকে যান, যার রচনা ও তত্ত্ব আজও মার্কসবাদী গবেষণা ও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
উপসংহার: কার্ল কাউটস্কি ছিলেন মার্কসবাদী চিন্তাধারার ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি মার্কস ও এঙ্গেলসের পর মার্কসবাদের প্রধান প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যদিও লেনিন ও বলশেভিকরা তাঁকে সমালোচনা করেছেন, তবু তাঁর তাত্ত্বিক অবদান আজও মার্কসবাদী গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।