- readaim.com
- 0
উত্তর::ভূমিকা: ‘কুলারিং’ শব্দটি এসেছে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের ট্রোব্রিয়ান্ড এবং অন্যান্য দ্বীপের অধিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী আদান-প্রদান (বাণিজ্য) ব্যবস্থা থেকে। এর কোনো সরাসরি বাংলা প্রতিশব্দ নেই, তবে এর মূল অর্থ হলো একটি নির্দিষ্ট ধরনের উপহার বিনিময় চক্র।
কুলারিং হলো ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান একটি প্রথা। এই প্রথায় লোকেরা প্রধানত দুটো মূল্যবান বস্তু—হংসী বা শঙ্খের তৈরি গলার হার (Soulava) এবং শামুক বা শঙ্খের তৈরি হাতের বাজু (Mwali ) —এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে একটি নির্দিষ্ট দিকে এবং নির্দিষ্ট নিয়মে বিনিময় করে। এটি শুধুমাত্র বাণিজ্য নয়, এটি মূলত সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক জোট এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরির একটি মাধ্যম।
কুলারিং প্রথাটি নৃ-বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বিষয়। তাই বিভিন্ন নৃ-বিজ্ঞানী এর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন:
১।ব্রনিস্লভ ম্যালিনোস্কি (Bronisław Malinowski): তাঁর ক্ল্যাসিক গ্রন্থ “আর্গোনটস অফ দ্য ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক” (১৯২২) -এ ম্যালিনোস্কি কুলারকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে—”কুলার হলো একটি সুদূরপ্রসারী ও জটিল আদান-প্রদান চক্র, যেখানে দু’ধরনের মূল্যবান বস্তু—শঙ্খের গলার হার (Soulava) এবং শঙ্খের তৈরি বাহুবন্ধনী (Mwali)—একটি নির্দিষ্ট দিকে এবং একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বিনিময় করা হয়। এটি কেবল বিনিময় নয়, এটি হলো উপাস্থিতি, জাদু, আচার-অনুষ্ঠান এবং মিত্রতার একটি সামাজিক ব্যবস্থা।”
২।মার্শেল মস (Marcel Mauss): তাঁর “উপহার” (The Gift) প্রবন্ধে (১৯২৫) মস কুলারকে বিশ্লেষণ করেছেন এমন একটি “সম্পূর্ণ সামাজিক ঘটনা” হিসেবে, যা অর্থনীতি, রাজনীতি, আইন, ধর্ম এবং নীতিনৈতিকতার সমন্বয়ে গঠিত।
৩।এডমন্ড লিচ (Edmund Leach): লিচ কুলারকে একটি “আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য” হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেও তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে।
৪।অ্যান্ড্রু উইনার (Annette B. Weiner): তিনি কুলারকে এমন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন, যা কেবল বস্তুর আদান-প্রদান নয়, বরং এটি “নারী ও শিশুদের উপর নিয়ন্ত্রণ” এবং সময়ের সাথে সাথে গোষ্ঠীর পরিচয় ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
৫।পল ভ্যান উইন্ডেন (Paul van Winden): তিনি কুলারকে এমন একটি জটিল আদান-প্রদান নেটওয়ার্ক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক এবং যোগাযোগের পথ সুগম করে।
৬।জেরাল্ড বার্নেট (H.G. Barnett): বার্নেট মনে করেন, কুলার হলো একটি “স্থিতাবস্থা বজায় রাখার প্রক্রিয়া”, যেখানে উপহারের মাধ্যমে ক্ষমতা এবং মর্যাদা বারবার পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়।
৭।ফ্রেডরিক বার্থ (Fredrik Barth): বার্থ কুলারকে একটি “রাজনৈতিক কৌশল” হিসেবে দেখেছেন, যা বিভিন্ন উপগোষ্ঠীর প্রধানদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করে।
উপরিউক্ত আলোচনা ও সংজ্ঞাগুলির আলোকে আমরা বলতে পারি: কুলারিং হলো ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপবাসীদের মধ্যে প্রচলিত একটি দীর্ঘস্থায়ী, আনুষ্ঠানিক ও আবর্তনশীল উপহার বিনিময় ব্যবস্থা, যা শঙ্খের হার ও বাজু বিনিময়ের মাধ্যমে উপজাতিগুলির মধ্যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখে এবং অংশগ্রহণকারীদের মর্যাদা ও খ্যাতি বৃদ্ধি করে।
উপসংহার: কুলারিং কেবল কিছু মূল্যবান সামগ্রীর আদান-প্রদান নয়; এটি আসলে ট্রোব্রিয়ান্ড সমাজের মূল ভিত্তি। এটি তাদের অর্থনীতিকে সচল রাখে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংহতি বজায় রাখে এবং উপজাতি প্রধানদের সামাজিক মর্যাদা ও খ্যাতিকে শক্তিশালী করে। নৃ-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এটি একটি কালজয়ী উদাহরণ যা প্রমাণ করে যে, মানব সমাজে অর্থনৈতিক লেনদেন সবসময় শুধুমাত্র মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে হয় না, বরং এর পেছনে গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণ বিদ্যমান থাকে।

