- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- কূটনীতি কী?
Or, কূটনীতি কাকে বলে?
Or, কূটনীতির সজ্ঞা দাও।
Or, কূটনীতি বলতে কী বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে কূটনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে। বর্তমান বিশ্বে কূটনীতি শুধু রাষ্ট্রীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা বিস্তৃত।
কূটনীতির পরিচয়:
কূটনীতি হলো রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা, যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে নিজের স্বার্থ রক্ষা করে। এটি যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান, সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার একটি কার্যকর পদ্ধতি।
কূটনীতির শাব্দিক অর্থ:
‘কূটনীতি’ শব্দটি ইংরেজি Diplomacy শব্দের বাংলা রূপ। গ্রিক শব্দ Diploma থেকে Diplomacy শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ হলো ভাঁজ করা দলিল বা সরকারি নথিপত্র। পরবর্তীতে এটি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ, আলোচনা ও সম্পর্ক পরিচালনার পদ্ধতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। শাব্দিক অর্থে কূটনীতি হলো রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক পরিচালনার কৌশল।
১। হ্যারল্ড নিকলসন (Harold Nicolson):
হ্যারল্ড নিকলসনের মতে, কূটনীতি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে আলোচনা ও যোগাযোগের একটি পদ্ধতি। তার মতে, কূটনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখে। (Diplomacy is the management of international relations by negotiation rather than by force.)
২। এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke):
এডমন্ড বার্ক কূটনীতিকে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক পরিচালনার একটি দক্ষ ও কৌশলগত পদ্ধতি হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, কূটনীতির মূল লক্ষ্য হলো আলোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য অর্জন করা এবং সংঘাত এড়িয়ে চলা। (Diplomacy is the art of conducting negotiations and managing relations between states.)
৩। আর্নেস্ট স্যাটো (Ernest Satow):
আর্নেস্ট স্যাটোর মতে, কূটনীতি হলো স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সরকারি সম্পর্ক পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত দক্ষতা ও পদ্ধতি। তার সংজ্ঞায় কূটনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সমঝোতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। (Diplomacy is the application of intelligence and tact to the conduct of official relations between governments of independent states.)
৪। হ্যান্স জে. মরগেনথাউ (Hans J. Morgenthau):
মরগেনথাউ কূটনীতিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থ বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তার মতে, দক্ষ কূটনীতি রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। (Diplomacy is an instrument of national power used to achieve foreign policy objectives.)
৫। কুইন্সি রাইট (Quincy Wright):
কুইন্সি রাইটের মতে, কূটনীতি হলো আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনা, সমঝোতা ও যোগাযোগের একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি। এটি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিরোধ কমাতে সহায়তা করে। (Diplomacy is the process of negotiation and communication through which states manage their relations.)
৬। পল শার্প (Paul Sharp):
পল শার্প কূটনীতিকে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিনিধিত্ব, যোগাযোগ ও সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, কূটনীতি আন্তর্জাতিক সমাজে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরিতে সহায়তা করে। (Diplomacy is the representation and communication of states in international society.)
উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, কূটনীতি হলো এমন একটি শান্তিপূর্ণ ও কৌশলগত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলো আলোচনা, যোগাযোগ ও সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করে। এটি বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
উপসংহার: কূটনীতি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অপরিহার্য উপাদান। আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা, বিরোধ নিরসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা কূটনীতির প্রধান উদ্দেশ্য। তাই বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর কূটনীতির গুরুত্ব অপরিসীম।