- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সংসদীয় সরকারে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে এবং সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। জবাবদিহি, নমনীয়তা, বিরোধী দলের ভূমিকা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের কারণে এই সরকারব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর বলে মনে করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর।
১। জনগণের সরকার: সংসদীয় সরকার জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সাধারণ নির্বাচনে জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতারা সরকার গঠন করেন। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে এবং সরকার জনস্বার্থের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল থাকে।
২। জবাবদিহিমূলক শাসন: সংসদীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে সংসদে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ভুল বা ব্যর্থতার জন্য সরকারকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়, যা প্রশাসনে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৩। সম্মিলিত দায়িত্ব: সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকে। কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি বা সিদ্ধান্তের দায়িত্ব একজন মন্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে সরকার দলগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং ভুল হলে সম্মিলিতভাবে তার দায় বহন করতে হয়, যা শাসনে শৃঙ্খলা আনে।
৪। অনাস্থার সুযোগ: সরকার জনগণের আস্থা হারালে সংসদ অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করতে পারে। এজন্য নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অজনপ্রিয় সরকারকে ক্ষমতায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই ব্যবস্থা সরকারকে জনগণ ও সংসদের আস্থা বজায় রেখে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হতে উৎসাহিত করে।
৫। নমনীয় ব্যবস্থা: সংসদীয় সরকার তুলনামূলকভাবে নমনীয়, কারণ রাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে সরকার পরিবর্তনের জন্য পুরো সাংবিধানিক কাঠামো বদলাতে হয় না। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ, মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন বা নতুন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতির সমাধান করা সম্ভব, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় সহায়ক।
৬। দ্রুত সিদ্ধান্ত: সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থন থাকলে সরকার তুলনামূলকভাবে দ্রুত আইন ও নীতি গ্রহণ করতে পারে। নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতা কমে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংসদীয় ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
৭। বিরোধী দলের ভূমিকা: সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনা করে। সংসদে প্রশ্ন, বিতর্ক ও প্রস্তাবের মাধ্যমে তারা সরকারের ভুল তুলে ধরে এবং বিকল্প নীতি উপস্থাপন করে। এর ফলে ক্ষমতাসীন দলের ওপর গণতান্ত্রিক চাপ থাকে এবং স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে।
৮। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ: সংসদীয় সরকারে নির্বাহী বিভাগ সরাসরি সংসদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। সরকারের নীতি ও ব্যয় সংসদীয় পর্যালোচনার মুখোমুখি হয়। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের সম্ভাবনা কমে এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর নজরদারি করতে পারেন, যা গণতান্ত্রিক শাসনকে শক্তিশালী করে।
৯। রাজনৈতিক ঐক্য: প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা সাধারণত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্য হওয়ায় নির্বাহী ও আইনসভার মধ্যে রাজনৈতিক সমন্বয় থাকে। এতে গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নীতি বাস্তবায়নে অচলাবস্থা কম হয়। সরকার ও সংসদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারাবাহিকতা ও কার্যকর সমন্বয় সৃষ্টি করে।
১০। দলীয় শৃঙ্খলা: সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকে। সরকার টিকিয়ে রাখতে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হয়। ফলে রাজনৈতিক দল নীতি ও কর্মসূচিভিত্তিকভাবে পরিচালিত হতে উৎসাহিত হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সংগঠিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠে।
১১। যোগ্য নেতৃত্ব: সংসদীয় সরকারে প্রধানমন্ত্রী সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি হন। মন্ত্রীরাও সংসদীয় কাজ ও জনসমস্যার সঙ্গে পরিচিত থাকেন। ফলে নীতিনির্ধারণে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও জনগণের দাবি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান ব্যবহারের সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে।
১২। জনমত গুরুত্ব: সংসদীয় সরকার সবসময় সংসদ ও জনগণের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করে। জনমত বিরূপ হলে সরকার নির্বাচনে পরাজিত বা সংসদে আস্থা হারাতে পারে। তাই জনস্বার্থ, গণমাধ্যমের সমালোচনা ও নাগরিক দাবির প্রতি সরকারকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিতে হয়।
১৩। সংকট সমাধান: রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে সংসদীয় ব্যবস্থায় নেতৃত্ব পরিবর্তন সহজ। একই সংসদের মধ্যেই নতুন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভা গঠন করা সম্ভব হতে পারে। এতে রাষ্ট্রের পুরো শাসনব্যবস্থা অচল না করে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করা যায় এবং প্রশাসনের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকে।
১৪। স্বৈরাচার রোধ: প্রধানমন্ত্রী শক্তিশালী হলেও তাকে সংসদ, দল ও জনমতের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হয়। সংসদের আস্থা হারালে সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারে না। এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের সুযোগ কমায় এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৫। সহযোগী সম্পর্ক: সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে বিরোধের চেয়ে সহযোগিতার সুযোগ বেশি থাকে। মন্ত্রীরা সংসদের সদস্য হওয়ায় আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় সহজ হয়। ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত পরিচালিত হয় এবং নীতি বাস্তবায়নে অপ্রয়োজনীয় বাধা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
১৬। শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন: সংসদীয় সরকারে নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ থাকে। জনগণ ভোটের মাধ্যমে অজনপ্রিয় সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন সরকার নির্বাচন করতে পারে। এর ফলে ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য সহিংসতা বা অসাংবিধানিক পথ গ্রহণের প্রয়োজন কমে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
১৭। গণতান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব: জবাবদিহি, নমনীয়তা, জনমতের গুরুত্ব, বিরোধী দলের সক্রিয়তা এবং শান্তিপূর্ণ সরকার পরিবর্তনের সুযোগ সংসদীয় ব্যবস্থাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেয়। এসব কারণে এটি রাষ্ট্রের ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিশাসিত বা অন্যান্য সরকারব্যবস্থার তুলনায় অধিক গণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হয়।
উপসংহার: সংসদীয় সরকার সব দিক থেকে ত্রুটিমুক্ত নয়, তবে এর জবাবদিহি, নমনীয়তা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ ও জনমতের কাছে সরকার দায়বদ্ধ থাকায় স্বেচ্ছাচারের সুযোগ কমে। শক্তিশালী বিরোধী দল ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি থাকলে সংসদীয় সরকার অধিক কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী হতে পারে।