- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন, যেখানে পরম ক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। আব্রাহাম লিংকনের মতে, এটি জনগণের, জনগণের দ্বারা ও জনগণের জন্য পরিচালিত সরকার। বর্তমান বিশ্বে এটিই সর্বোত্তম রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। তবে তত্ত্বগতভাবে এটি যতটা চমত্কার ও কল্যাণকর, বাস্তব জীবনে এর সফল রূপায়ণ ঠিক ততটাই জটিল ও চর্তুমুখী চ্যালেঞ্জে ভরা।
গণতন্ত্র সর্বোত্তম সরকার ব্যবস্থা, কিন্তু বাস্তবায়ন খুব কঠিন:-
১। জনগণের অংশগ্রহণ: গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রের সব স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে। রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণে সাধারণ জনগণের সার্বিক সচেতনতা ও সক্রিয় ভূমিকার অভাব রয়েছে। ফলে শাসনব্যবস্থায় জনআকাঙ্ক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
২। আইনের শাসন: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের চোখে সবাই সমান এবং সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। কিন্তু উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে আইনের এই নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রভাবশালী ও অর্থবান ব্যক্তিরা প্রায়ই আইনকে নিজেদের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
৩। সহনশীলতার অভাব: বহুদলীয় গণতন্ত্রে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি গণতন্ত্রের পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। পরমতসহিষ্ণুতার এই ঘাটতির কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা ও সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন দুর্বল হতে থাকে।
৪। দুর্নীতি প্রতিরোধ: একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান কাজ হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন করা। বাস্তব চিত্র হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে बुरीভাবে বাধাগ্রস্ত করে। যখন রক্ষকই ভক্ষক হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ হয়। দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা না গেলে গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।
৫। শিক্ষার বিস্তার: সচেতন নাগরিক গড়ে তোলার জন্য মানসম্মত শিক্ষার বিস্তার অপরিহার্য শর্ত। অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রায়ই নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অসচেতন থাকে। তারা যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় এবং আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তাই শতভাগ শিক্ষার আলো ছাড়া গণতন্ত্রের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
৬। অর্থনৈতিক বৈষম্য: সমাজে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার আকাশচুম্বী ব্যবধান গণতন্ত্রের আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। অর্থহীন মানুষের কাছে ভোটাধিকার বা বাকস্বাধীনতার চেয়ে দুমুঠো ভাতের সংস্থান করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহজেই অর্থের লোভ দেখিয়ে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়। ফলে পুঁজিবাদ ও কালোটাকার প্রভাবে গণতন্ত্রের মূল চেতনা ঢাকা পড়ে যায়।
৭। যোগ্য নেতৃত্ব: দূরদর্শী, সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া কোনো শাসনব্যবস্থাই সফল হতে পারে না। গণতন্ত্রে অনেক সময় মেধার চেয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার জোরে অযোগ্য ব্যক্তিরা ক্ষমতার শীর্ষে চলে আসে। এই অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে রাষ্ট্র সঠিক দিকনির্দেশনা হারায় এবং জনকল্যাণমূলক কাজ থমকে দাঁড়ায়। সঠিক ও যোগ্য নেতা নির্বাচন করা তাই গণতন্ত্রের অন্যতম কঠিন কাজ।
৮। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়, যা সরকারের ভুলত্রুটি জনসমক্ষে তুলে ধরে। তবে বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের ওপর নানা ধরনের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক সময় গণমাধ্যম নিজেই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুপস্থিতিতে গণতন্ত্রের ভিত্তি অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
৯। সুষ্ঠু নির্বাচন: নিয়মিত বিরতিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান গণতন্ত্রের প্রাণস্বরূপ। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কারচুপি, সহিংসতা ও পেশিশক্তির মহড়া দেখতে পাওয়া যায়। যখন সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে না, তখন পুরো ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা উঠে যায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা তাই বড় পরীক্ষা।
১০। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: সরকারের গৃহীত নীতি ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে আমলাতন্ত্রের ওপর। অনেক সময় আমলাদের অহেতুক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও অদক্ষতার কারণে জনকল্যাণমূলক কাজ ধীরগতির হয়ে পড়ে। আমলাতন্ত্র যদি জনগণের সেবক না হয়ে শাসকের ভূমিকা নেয়, তবে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এই প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা অত্যন্ত দুরূহ।
১১। মৌলবাদের উত্থান: উগ্রপন্থা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় মৌলবাদ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই অপশক্তিগুলো সমাজের বৈচিত্র্য ও ভিন্নমতের অস্তিত্বকে কোনোভাবেই মেনে নিতে চায় না। তারা সমাজে বিভাজন তৈরি করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আঘাত হানে। এদের দমন করে একটি অসাম্প্রদায়িক ও উদার গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা বেশ কঠিন।
১২। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা: সরকারের অন্যান্য অঙ্গ থেকে বিচারবিভাগের সম্পূর্ণ পৃথকীকরণ ও স্বাধীনতা রক্ষা করা আবশ্যক। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে যদি বিচারালয় প্রভাবিত হয়, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু ধ্বংস হয়ে যায়। এই স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।
১৩। অধিকার সচেতনতা: নাগরিকরা যদি নিজেদের মৌলিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকে, তবে গণতন্ত্র সফল হয় না। কেবল অধিকার দাবি করাই যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যও সমানভাবে পালন করতে হয়। সাধারণ মানুষের এই নাগরিক সচেতনতার অভাবের সুযোগ নিয়ে শাসকগোষ্ঠী স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। তাই প্রতিটি নাগরিককে অধিকার সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি।
১৪। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পরপর সরকার পরিবর্তন হওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে নতুন সরকার এসে যদি পূর্ববর্তী সরকারের ভালো প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বন্ধ করে দেয়, তবে দেশের ক্ষতি হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চার ফলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। জাতীয় স্বার্থে এই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানো খুবই কঠিন।
১৫। সংখ্যালঘুর সুরক্ষা: একটি সফল গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করা। সংখ্যাগুরুদের আধিপত্যের কারণে যেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অবহেলিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে দলগুলো সংখ্যালঘুদের স্বার্থকে অবহেলা করে। তাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা তাই অনেক বড় দায়িত্ব।
১৬। কালোটাকার প্রভাব: আধুনিক নির্বাচন ব্যবস্থায় টাকার খেলা একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরা অনেক সময় পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। অন্যদিকে, অপরাধী ও কালোটাকার মালিকরা অনায়াসে দলীয় মনোনয়ন ও জয় ছিনিয়ে নেয়। এই অর্থসর্বস্ব রাজনীতি সাধারণ মানুষের শাসন প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করে দেয়।
১৭। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী হওয়া জরুরি। এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে গণতন্ত্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে। দলীয়করণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়, তখন শাসনব্যবস্থায় ধস নামে। এদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৮। জনগণের ধৈর্য: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যেকোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে বেশ দীর্ঘ সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। অনেক সময় সাধারণ মানুষ দ্রুত সুফল পাওয়ার আশায় উগ্র বা একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে চায় না যে, একনায়কতন্ত্র সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে। জনগণের এই মানসিকতা পরিবর্তন করা এবং ধৈর্য বজায় রাখা কঠিন।
পরিশেষে বলা যায়, গণতন্ত্র কোনো তৈরি পোশাক নয় যে চাইলেই গায়ে জড়িয়ে নেওয়া যাবে, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি চর্চার বিষয়। নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নগত কঠিন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং জনগণের সচেতন প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবল এই কঠিন পথকে সহজ করে গণতন্ত্রের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।