- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সুশাসন। আর এই সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান পূর্বশর্ত হলো প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সরকারি কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে এর কোনো বিকল্প নেই। নিম্নে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের কার্যকর উপায়সমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের উপায়সমূহ:-
১। তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণ: জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে আইনগতভাবে পুরোপুরি কার্যকর করতে হবে। যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সরকারি সিদ্ধান্ত, বাজেট এবং প্রকল্প সম্পর্কে সহজে জানতে পারবে, তখন প্রশাসনের কাজের স্বচ্ছতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। তথ্য লুকিয়ে রাখার সংস্কৃতি দূর করে সবকিছু সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। এতে জনগণের কাছে প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।
২। ডিজিটালাইজেশন বা ই-গভর্নেন্স: প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়ায় সরকারি সকল সেবা ও কার্যক্রমকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে হবে। ই-গভর্নেন্স চালুর ফলে ফাইলের গতিবিধি যেমন ট্র্যাক করা যায়, তেমনি কাজের গতিও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। সাধারণ মানুষ ঘরে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরকারি ফরম পূরণ ও ফি প্রদান করতে পারে। এটি মানুষের ভোগান্তি কমায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
৩। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা: আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতিটি প্রশাসনে কঠোরভাবে বজায় রাখতে হবে। পদমর্যাদা নির্বিশেষে যেকোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব বা রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়া আইন তার নিজস্ব গতিতে চললে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। এতে কর্মচারীদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার এবং দায়িত্বশীল আচরণ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
৪। স্বাধীন দুর্নীতি দমন: দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। যেকোনো স্তরের সরকারি কর্মকর্তার আর্থিক অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে এই সংস্থাকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া যখন এই প্রতিষ্ঠান অপরাধীদের বিচার করতে পারবে, তখন দুর্নীতি অনেকাংশে কমে যাবে। এতে প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও ভরসা পুনর্প্রতিষ্ঠিত হবে।
৫। মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া: সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা বা স্বজনপ্রীতি সম্পূর্ণ বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যখন দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা নিয়োগ পাবেন, তখন তারা জনকল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করবেন। যোগ্য ব্যক্তিরা সঠিক স্থানে থাকলে কাজের মান বাড়ে এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনিয়ম হ্রাস পায়।
৬। দক্ষ অডিট ব্যবস্থা: সরকারি প্রতিটি দপ্তরের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ অডিট টিম থাকতে হবে। কোনো প্রকল্প বা খাতের খরচে সামান্যতম গরমিল বা অসঙ্গতি দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তার জবাবদিহিতা চাইতে হবে। নিয়মিত এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিটের ভয় থাকলে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাৎ করার সাহস কেউ পাবে না। ফলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
৭। নাগরিক সনদ বাস্তবায়ন: প্রতিটি সরকারি অফিসে ‘সিটিজেন চার্টার’ বা নাগরিক সনদ দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোন সেবা পেতে কত দিন সময় লাগবে এবং তার খরচ কত, তা এই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং কোনো কর্মকর্তা অযথা সময় নষ্ট করতে পারেন না। এটি জনগণের কাছে প্রশাসনের জবাবদিহিতা সরাসরি নিশ্চিত করে।
৮। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রদান: সংবাদপত্র ও টেলিভিশনসহ সকল প্রকার গণমাধ্যমকে নির্ভীকভাবে সত্য প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। প্রশাসনের কোনো স্তরে অনিয়ম, ঘুষ বা ক্ষমতার অপব্যবহার হলে গণমাধ্যম তা জনগণের সামনে তুলে ধরে। এই ধরনের গঠনমূলক সমালোচনা ও প্রকাশ্য প্রতিবেদন প্রশাসনকে নিজেদের ভুলত্রুটি শুধরে নিতে এবং সতর্ক হতে বাধ্য করে। একটি স্বাধীন গণমাধ্যম সবসময় প্রশাসনের ওপর নজরদারি বজায় রাখে।
৯। যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান: সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে সেবামূলক মনোভাব গড়ে তোলা সম্ভব। যখন কর্মচারীরা জানবেন কীভাবে দক্ষতার সাথে এবং সততার সাথে কাজ করতে হয়, তখন প্রশাসনিক জবাবদিহিতা অর্জিত হবে। ভালো প্রশিক্ষণ পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
১০। ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি: সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয়ভাবে একজন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ ‘ন্যায়পাল’ নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনের যেকোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিকরা ন্যায়পালের কাছে সরাসরি অভিযোগ করতে পারবেন। ন্যায়পাল সেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবেন। এটি প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
১১। সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা: জাতীয় সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে হবে। এই কমিটিগুলো নিয়মিত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ, বাজেট বাস্তবায়ন এবং নীতিমালার অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। মন্ত্রী ও আমলাদের এই কমিটির মুখোমুখি হয়ে নিজেদের কাজের ব্যাখ্যা ও জবাব দিতে বাধ্য করা উচিত। সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী হলে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে এক ধরনের জবাবদিহিতা তৈরি হয়।
১২। গণশুনানির আয়োজন করা: সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত বিরতিতে সাধারণ জনগণের উপস্থিতিতে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। এই শুনানিতে নাগরিকরা তাদের বিভিন্ন সমস্যা, অভিযোগ ও ভোগান্তির কথা সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরবেন। কর্মকর্তারাও তাৎক্ষণিকভাবে সেই সব সমস্যার সমাধান দিতে বা কৈফিয়ত দিতে বাধ্য থাকবেন। এই প্রক্রিয়াটি প্রশাসনের সাথে জনগণের দূরত্ব কমিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
১৩। উপযুক্ত পারিশ্রমিক নির্ধারণ: সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে উপযুক্ত বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা উচিত। যখন একজন চাকুরিজীবী তার সৎ উপার্জনের টাকা দিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবার চালাতে পারবেন, তখন তার দুর্নীতি করার প্রবণতা কমে যাবে। আর্থিক নিরাপত্তা মানুষকে অসৎ পথ থেকে দূরে রাখে এবং সততার সাথে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এটি পরোক্ষভাবে প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়ায়।
১৪। পুরস্কার ও শাস্তি: ভালো কাজের জন্য স্বীকৃতি এবং মন্দ কাজের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নীতি প্রশাসনে কঠোরভাবে চালু করতে হবে। যে সকল কর্মকর্তা সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে সেবা দেবেন, তাদের পদোন্নতি ও বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করতে হবে। অন্যদিকে, অবহেলা ও দুর্নীতির প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত বা বিভাগীয় মামলার ব্যবস্থা করতে হবে। এই ব্যবস্থার ফলে দক্ষ ব্যক্তিরা উৎসাহিত হবে এবং অদক্ষরা সতর্ক হবে।
১৫। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা: রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা থাকতে হবে। আমলারা যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়ে কেবল দেশের আইন ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাজনীতি ও প্রশাসনের এই সুস্থ সমন্বয় ও ভারসাম্য বজায় থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
১৬। সহজ আইনি প্রক্রিয়া: সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বা সেবার বিরুদ্ধে নাগরিকরা যাতে সহজে এবং কম খরচে আদালতে আইনি প্রতিকার পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এই প্রক্রিয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসন যখন জানবে যে তাদের অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে এবং বিচার হবে, তখন তারা নিয়ম মেনে কাজ করতে বাধ্য থাকবে।
১৭। জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা: সাধারণ জনগণকে তাদের নিজস্ব অধিকার, সরকারি নিয়মকানুন এবং সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। সচেতন নাগরিক সমাজ কখনো প্রশাসনের অন্যায় বা অনিয়ম মুখ বুজে সহ্য করে না, বরং তারা প্রতিবাদ জানায়। অধিকার সচেতন মানুষ যখন সরকারি কাজের হিসাব চাইতে শুরু করবে, তখন প্রশাসন নিজ উদ্যোগেই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আচরণ করতে বাধ্য হবে।
১৮। অনলাইন টেন্ডার ব্যবস্থা: সরকারি সব ধরনের কেনাকাটা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং ঠিকাদারি কাজের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ‘ই-টেন্ডারিং’ বা অনলাইন টেন্ডার ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। এই ব্যবস্থার ফলে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি টেন্ডারবাজি বা জালিয়াতি করার সুযোগ পায় না। যোগ্য ও প্রকৃত ঠিকাদাররা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কাজ পান, যার ফলে কাজের গুণগত মান বৃদ্ধি পায় এবং আর্থিক স্বচ্ছতা পুরোপুরি বজায় থাকে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি উন্নত রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। ওপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জনগণের সচেতনতাই পারে প্রশাসনকে জনগণের সেবকে পরিণত করতে। একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল বৈষম্যহীন, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব।