- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: একটি দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং টেকসই অগ্রগতির প্রধান শর্ত হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও সন্ত্রাস একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি হিসেবে রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়, ক্ষমতার মোহ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে নির্বাচন এলেই জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।
নির্বাচনে সন্ত্রাসের কারণসমূহ:
১। ক্ষমতার লোভ: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে অসীম শক্তি এবং সম্পদের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা যেকোনো মূল্যে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে চায়। এই অতিমাত্রার ক্ষমতার লোভ তাদের নৈতিকতাকে ধুলিসাৎ করে সহিংস পন্থার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পেশিশক্তির ব্যবহার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়।
২। জবাবদিহিতার অভাব: রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মীদের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা এবং জবাবদিহিতার চরম অভাব রয়েছে। অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি করে। যখন সন্ত্রাসীরা দেখে যে সহিংসতা করেও তাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না, তখন তারা দ্বিগুণ উৎসাহে নির্বাচনী মাঠে তাণ্ডব চালায়। এই জবাবদিহিতাহীন অবস্থা নির্বাচনী সন্ত্রাসকে দিন দিন আরও বেশি উসকে দিচ্ছে।
৩। আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা: নির্বাচনকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের অভাব অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক সময় তারা ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী মহলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হয়। নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ না হওয়ায় সাধারণ ভোটার ও বিরোধীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আইন-শৃঙ্খলার এই ভঙ্গুর ও পক্ষপাতদুষ্ট রূপই নির্বাচনী সহিংসতাকে মূলত নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে।
৪। কালো টাকার প্রভাব: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নির্বাচনে টাকার খেলা একটি ওপেন সিক্রেট বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু প্রার্থীরা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ব্যয় করে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও মাস্তান বাহিনীকে ভাড়া করে। এই টাকা দিয়ে অস্ত্র কেনা, ভোটারদের ভয় দেখানো এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার কাজ চলে। মূলত কালো টাকার অবাধ প্রবাহই নির্বাচনী মাঠে অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং সন্ত্রাসের জন্ম দেয়।
৫। পেশিশক্তির ব্যবহার: নির্বাচনে জয়লাভের জন্য জনপ্রিয়তার চেয়ে এখন লাঠিয়াল ও পেশিশক্তির ওপর বেশি ভরসা করা হয়। প্রার্থীরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এবং ভোটকেন্দ্র দখল করতে স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে জোরপূর্বক ব্যালট বাক্স ভরার জন্য এই শক্তির মহড়া দেওয়া হয়। ফলে সুস্থ ধারার রাজনীতির জায়গা দখল করে নেয় সহিংসতা ও পেশিশক্তি।
৬। সহনশীলতার অভাব: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য এবং সহনশীলতার সংস্কৃতি একেবারেই অনুপস্থিত। এক দল অন্য দলকে শত্রু মনে করে এবং যেকোনো উপায়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। পরমতসহিষ্ণুতা না থাকায় সামান্য বিষয় নিয়ে কর্মীবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এই উগ্র রাজনৈতিক মানসিকতা ও পরশ্রীকাতরতা নির্বাচনের পুরো পরিবেশকে বিষাক্ত এবং সহিংস করে তোলে।
৭। বেকারত্ব ও যুবসমাজ: দেশের বিশাল বেকার যুবসমাজকে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত সহজে ব্যবহার করে। কর্মসংস্থানহীন তরুণদের সামান্য অর্থ, মাদক বা ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে মিছিলে ও সহিংসতায় নামানো হয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ এই যুবকেরা রাজনৈতিক নেতাদের অন্ধ অনুসারী হয়ে নির্বাচনী মাঠে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে। যুবসমাজের এই অপব্যবহারই নির্বাচনী সন্ত্রাসের অন্যতম একটি মূল চালিকাশক্তি।
৮। পেশাদার অপরাধী: প্রতিটি অঞ্চলেই কিছু পেশাদার অপরাধী, ডাকাত ও মাস্তান চক্র সক্রিয় থাকে যাদের মূল ব্যবসাই সন্ত্রাস। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক প্রার্থীরা নিজেদের স্বার্থে এই পেশাদার অপরাধীদের চড়া মূল্যে ভাড়া করে নিয়ে আসে। এই অপরাধীরা অর্থের বিনিময়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং নির্বাচনী ক্যাম্প ভাঙচুরের মতো কাজ করে। রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ায় নির্বাচনের পর এরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
৯। দরিদ্রতার সুযোগ: উন্নয়নশীল দেশের একটি বড় অংশের মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। অসৎ রাজনীতিবিদরা এই দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বকে পুঁজি করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। সামান্য টাকা বা ত্রাণের লোভ দেখিয়ে এদের অনেককে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করা হয়। দারিদ্র্যের এই নির্মম সুযোগ নিয়ে ভোটারদের প্রভাবিত ও আতঙ্কিত করা সন্ত্রাসের আরেকটি বড় কারণ।
১০। কমিশনের দুর্বলতা: নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর ক্ষমতার অভাব রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে কমিশন অনেক সময় কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। একটি দুর্বল ও অকার্যকর কমিশন পরোক্ষভাবে নির্বাচনী সন্ত্রাস বৃদ্ধির পথ সুগম করে।
১১। অস্ত্রের সহজলভ্যতা: নির্বাচনের আগে ও নির্বাচন চলাকালীন সময়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অনুপ্রবেশ এবং ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। দেশের সীমান্ত এলাকা বা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সহজেই সন্ত্রাসীদের হাতে মারাত্মক অস্ত্র পৌঁছে যায়। লাইসেন্সবিহীন এই অস্ত্রের আস্ফালন সাধারণ ভোটারদের মনে চরম ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। প্রশাসন অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর না হওয়ায় নির্বাচনী সহিংসতা কমানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
১২। বিচারহীনতার সংস্কৃতি: অতীতে নির্বাচনী সহিংসতায় জড়িত থাকা অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া একটি খারাপ নজির তৈরি করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবে বা আইনি ফাঁকফোকরে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে অপরাধীদের মনে আইনের কোনো ভয় থাকে না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী তৈরি হতে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করছে। যখন অপরাধের বিচার হয় না, তখন সমাজে সন্ত্রাসের বিস্তার অনিবার্য হয়ে ওঠে।
১৩। নেতৃত্বের অন্ধত্ব: রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের অন্ধ দলপ্রীতি এবং উসকানিমূলক বক্তব্য মাঠপর্যায়ে আগুন জ্বালায়। অনেক সময় নেতারা কর্মীদের শান্ত করার পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। এই ধরনের দায়িত্বহীন ও উগ্র বক্তব্য কর্মীদের উগ্রপন্থী হতে এবং সহিংসতায় লিপ্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে। নেতৃত্বের এই অন্ধত্ব ও দূরদর্শিতার অভাবই মাঠপর্যায়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণ।
১৪। মিডিয়ার পক্ষপাতিত্ব: গণমাধ্যমের একাংশের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা এবং সঠিক তথ্য গোপন করার প্রবণতা সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় মূল অপরাধীদের আড়াল করে বিরোধী পক্ষকে ফাঁসানোর মনগড়া সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এর ফলে প্রকৃত অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সমাজে চরম বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। গণমাধ্যমের এই নিরপেক্ষতাহীনতা এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ পরোক্ষভাবে নির্বাচনী সহিংসতাকে উসকে দিতে সাহায্য করে।
১৫। শিক্ষার অভাব: তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক শিক্ষার সঠিক আলো পৌঁছায়নি। তারা সুস্থ গণতন্ত্রের চর্চা এবং ভোটাধিকারের প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নয়। শিক্ষার অভাবের কারণে তারা সহজেই স্বার্থান্বেষী মহলের মিথ্যা প্ররোচনা ও গুজবে কান দেয়। এই অসচেতনতা ও হুজুগপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে দাঙ্গাবাজরা খুব সহজেই বিশাল সহিংসতা বাঁধিয়ে দিতে পারে।
১৬। আঞ্চলিক আধিপত্য: গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় বংশীয় মর্যাদা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং আধিপত্য বিস্তারের এক চরম প্রতিযোগিতা থাকে। স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে এই আঞ্চলিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এক রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করে। এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীকে দমন করে এলাকায় নিজের একক রাজত্ব কায়েম করতে চায়। এই সামাজিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই নির্বাচন এলে অবধারিতভাবে সন্ত্রাসে রূপ নেয়।
১৭। প্রশাসনের পক্ষপাত: সিভিল প্রশাসন ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। নিজেদের পদোন্নতি বা ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য তারা ক্ষমতাসীন দলের অন্যায় আবদার ও সহিংসতাকে চোখ বুজে সহ্য করে। প্রশাসনের এই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পক্ষপাতিত্ব বিরোধী দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং মাঠের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে। একটি মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন কখনোই সহিংসতামুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পারে না।
১৮। গুজবের বিস্তার: বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করে দ্রুত গুজব ছড়িয়ে দেওয়া নির্বাচনী সন্ত্রাসের নতুন কারণ। নির্বাচনের দিন বা তার আগে মিথ্যা তথ্য বা উসকানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই আবেগের বশে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হয় এবং ভাঙচুর চালায়। এই প্রযুক্তিনির্ভর গুজবের সংস্কৃতি বর্তমান সময়ে নির্বাচনী সহিংসতাকে এক ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে গেছে।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে নির্বাচনী সন্ত্রাস একটি জটিল ও বহুমুখী জাতীয় সমস্যা। এটি কেবল গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নকেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা, শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই। সচেতন নাগরিক সমাজ এবং যুবসমাজ যদি সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, তবেই একটি সুন্দর, নিরাপদ ও উৎসবমুখর নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।