- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি এবং ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা। বর্তমান কার্যক্রম বিচার করলে বলা যায়, বিরোধী দল কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখলেও তাদের ভূমিকা এখনো পুরোপুরি যথার্থ ও পরিপূর্ণ নয়।
বর্তমান বাংলাদেশে বিরোধী দলের ভূমিকা কি যথার্থ:
১। সরকারের সমালোচনা: বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন নীতি, আইন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সমালোচনা করছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, দ্রব্যমূল্য এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় সংসদে তুলে ধরা হয়েছে। এটি সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকা।
২। জবাবদিহির দাবি: সরকারের কর্মকাণ্ডকে জবাবদিহির মধ্যে আনার চেষ্টা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বর্তমান বিরোধী দল সংসদে প্রশ্ন, বক্তব্য ও আপত্তির মাধ্যমে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করছে। তবে এই জবাবদিহি আরও নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক হলে সংসদীয় গণতন্ত্র অধিক শক্তিশালী হবে।
৩। সংস্কার প্রশ্ন: জুলাই জাতীয় সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিরোধী দল সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে। তারা সংস্কার প্রক্রিয়ায় অধিক অংশগ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্কারে সরকারকে চাপের মধ্যে রাখা গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের যথার্থ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
৪। আইন পর্যালোচনা: বিরোধী দল মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনসহ বিভিন্ন বিলের বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি তুলেছে। আইন দুর্বল বা অসম্পূর্ণ মনে হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংসদীয় বিরোধিতার স্বাভাবিক অংশ। এতে আইন প্রণয়নে অধিক আলোচনা ও সতর্কতার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
৫। সংসদীয় অধিকার: বিরোধী সদস্যরা সংসদে প্রশ্ন করার সুযোগ ও কমিটির নেতৃত্বে প্রতিনিধিত্বের দাবিও তুলেছেন। বিরোধীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে তাদের প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। এ ধরনের অধিকার দাবি করা কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সংসদ প্রতিষ্ঠার জন্য যৌক্তিক।
৬। জনস্বার্থ প্রকাশ: দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ, গ্যাস, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়ে বিরোধী দল জনগণের উদ্বেগ সংসদে তুলে ধরছে। জনগণের সমস্যা রাষ্ট্রীয় আলোচনায় নিয়ে আসা বিরোধী দলের মৌলিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে বর্তমান বিরোধী দলের ভূমিকা কিছুটা যথার্থ বলে বিবেচিত হয়।
৭। বিকল্প মত: সরকার যে নীতি গ্রহণ করে তার বিপরীতে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বর্তমান বিরোধী দল সংস্কার, আইন ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি নিয়ে বিকল্প অবস্থান তুলে ধরছে। তবে আরও সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিকল্প নীতি উপস্থাপন করলে তাদের ভূমিকা অধিক কার্যকর হবে।
৮। ওয়াকআউট কৌশল: বিভিন্ন বিল ও সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে বিরোধী দল একাধিকবার সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি হিসেবে ওয়াকআউট গ্রহণযোগ্য হলেও ঘনঘন সংসদ ত্যাগ করলে বিতর্ক ও আইন সংশোধনে সরাসরি প্রভাব রাখার সুযোগ কমে যায়।
৯। কমিটি বর্জন: কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে সংসদীয় কমিটির আলোচনা বিরোধী সদস্যরা বর্জন করেছেন। তাদের অভিযোগ ছিল যথাযথ পরামর্শের অভাব। তবে সংসদীয় কমিটিই আইন বিস্তারিত পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র; তাই বর্জনের বদলে যুক্তি, সংশোধনী ও ভোটের মাধ্যমে বিরোধিতা অধিক কার্যকর হতে পারে।
১০। রাজপথের আন্দোলন: বিরোধী জোট সংসদের পাশাপাশি রাজপথে কর্মসূচি ও লংমার্চ করেছে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও সংসদ কার্যকর থাকা অবস্থায় রাজনৈতিক বিরোধের প্রধান ক্ষেত্র সংসদ হওয়া উচিত। অতিরিক্ত রাজপথনির্ভরতা সংসদীয় রাজনীতির গুরুত্ব দুর্বল করতে পারে।
১১। গঠনমূলক বিরোধিতা: বিরোধীদলীয় নেতা সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার এবং গঠনমূলক ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার করেছিলেন। এ ধরনের অবস্থান ইতিবাচক। তবে ঘোষিত গঠনমূলক ভূমিকা কার্যকর করতে নিয়মিত উপস্থিতি, বিস্তারিত নীতি-সমালোচনা এবং বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাব আরও প্রয়োজন।
১২। প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য: সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব সরকারের ওপর নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সংসদে কমিটির সভাপতিত্ব নিয়ে বিরোধী দলের অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। কার্যকর বিরোধিতা চাইলে সরকারি দলকেও বিরোধীদের পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ দিতে হবে; দায়িত্ব শুধু বিরোধী দলের নয়।
১৩। রাজনৈতিক সহনশীলতা: বিরোধী দলের সমালোচনা কঠোর হলেও তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ বা সহিংসতায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের সহনশীলতা প্রয়োজন। গঠনমূলক মতপার্থক্যই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, সংঘাতমুখী প্রতিযোগিতা নয়।
১৪। বহুমতের প্রকাশ: বর্তমান বিরোধী শিবিরে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত সংসদে প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে জোটের ভেতরে মতপার্থক্য ও সমন্বয়ের সমস্যা থাকলে ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর বিরোধী ভূমিকা পালনে দুর্বলতা সৃষ্টি হতে পারে।
১৫। নিয়মিত অংশগ্রহণ: কার্যকর বিরোধী দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সংসদে নিয়মিত উপস্থিতি, বিতর্ক, প্রশ্ন ও কমিটিতে অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের অতীত রাজনীতিতে সংসদ বর্জনের প্রবণতা বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করেছে। তাই বর্তমান বিরোধীদের সংসদকেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রধান মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
১৬। জনগণের বিকল্প: বিরোধী দলকে শুধু সরকারের সমালোচক নয়, ভবিষ্যৎ বিকল্প সরকার হিসেবেও নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এজন্য অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তবসম্মত কর্মসূচি প্রয়োজন। বর্তমান বিরোধীরা সমালোচনায় সক্রিয় হলেও পূর্ণাঙ্গ বিকল্প নীতির উপস্থাপন আরও শক্তিশালী করা দরকার।
১৭। সামগ্রিক মূল্যায়ন: বর্তমান বাংলাদেশের বিরোধী দলের ভূমিকা আংশিকভাবে যথার্থ বলে মনে হয়। তারা সংসদে জনস্বার্থ, সংস্কার ও আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যা ইতিবাচক। তবে ঘনঘন ওয়াকআউট, কমিটি বর্জন ও রাজপথনির্ভরতার পরিবর্তে সংসদীয় বিতর্ক ও বিকল্প নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
উপসংহার: বর্তমান বাংলাদেশের বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহি, আইন পর্যালোচনা এবং সংস্কারের দাবি উত্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তাদের ভূমিকা পুরোপুরি যথার্থ করতে সংসদে নিয়মিত অংশগ্রহণ, গঠনমূলক সমালোচনা ও বাস্তবসম্মত বিকল্প নীতি আরও বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি দলকেও বিরোধীদের কার্যকর ভূমিকা পালনের যথেষ্ট গণতান্ত্রিক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।