- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- মানব সৃষ্ট বিপর্যয় কিা?
Or, মানব সৃষ্ট বিপর্যয় কাকে বলে?
Or, মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের সজ্ঞা দাও।
Or, মানব সৃষ্ট বিপর্যয় বলতে কি বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: মানব সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে নতুন নতুন ঝুঁকি ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি হচ্ছে। যুদ্ধ, শিল্প দুর্ঘটনা, পরিবেশ দূষণ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর বড় ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানুষের পরিকল্পনা, ভুল সিদ্ধান্ত বা অসচেতন কর্মকাণ্ডের ফলে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তাকে মানব সৃষ্ট বিপর্যয় বলা হয়।
মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের পরিচয়:-
মানব সৃষ্ট বিপর্যয় হলো এমন একটি দুর্যোগ বা সংকট, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষের কর্মকাণ্ড, ভুল সিদ্ধান্ত, অব্যবস্থাপনা বা অসতর্কতার কারণে সৃষ্টি হয় এবং মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো স্বাভাবিকভাবে সৃষ্টি হয় না; বরং মানুষের কার্যকলাপের ফল হিসেবে সংঘটিত হয়। যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, শিল্প দুর্ঘটনা, রাসায়নিক দূষণ, পারমাণবিক দুর্ঘটনা, বন উজাড় ও জলবায়ু পরিবর্তন মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের উদাহরণ।
মানব সৃষ্ট বিপর্যয়– এর শাব্দিক অর্থ:- মানব সৃষ্ট বিপর্যয় শব্দটি ইংরেজি “Man-made Disaster” শব্দের বাংলা রূপ। “Man-made” অর্থ হলো মানুষের দ্বারা সৃষ্ট এবং “Disaster” অর্থ হলো বিপর্যয়, দুর্যোগ বা ভয়াবহ ক্ষতি। অর্থাৎ মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক ঘটনা বা সংকটকে মানব সৃষ্ট বিপর্যয় বলা হয়।
১। জাতিসংঘ (United Nations – UN): মানব সৃষ্ট বিপর্যয় হলো এমন দুর্যোগ, যা মানুষের কর্মকাণ্ড, ভুল ব্যবস্থাপনা বা সংঘাতের কারণে সৃষ্টি হয় এবং সমাজের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করে। (“Man-made disasters are disasters resulting from human intent, negligence, or error that cause serious disruption and loss.”) এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড উভয়ই বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
২। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization – WHO): মানব সৃষ্ট বিপর্যয় হলো মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট এমন ঘটনা, যা মানুষের স্বাস্থ্য, জীবন ও কল্যাণের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। (“Man-made disasters are events caused by human actions that result in significant impacts on human health and well-being.”) এই ধারণা অনুযায়ী, যুদ্ধ, রাসায়নিক দুর্ঘটনা ও শিল্প দুর্ঘটনা মানুষের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করে।
৩। ফ্র্যাঙ্ক বাটলার (Frank Butler): মানব সৃষ্ট বিপর্যয় মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত, অবহেলা বা পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে সৃষ্টি হতে পারে। (“Man-made disasters often occur due to human error, negligence and failure of management systems.”) এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, যথাযথ পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়।
৪। গিলবার্ট এফ. হোয়াইট (Gilbert F. White): দুর্যোগ শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; মানুষের সিদ্ধান্ত ও আচরণও দুর্যোগের মাত্রা বৃদ্ধি করতে পারে। (“Disasters are not simply natural events but are shaped by human decisions and actions.”) এই ধারণা অনুযায়ী, মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ড অনেক সময় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৫। কেনেথ হিউইট (Kenneth Hewitt): বিপর্যয় হলো এমন একটি সামাজিক ঘটনা, যেখানে মানুষের দুর্বলতা ও কর্মকাণ্ড ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণ করে। (“Disasters are social phenomena shaped by vulnerability and human conditions.”) এই সংজ্ঞা মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা ও সামাজিক দুর্বলতাকে গুরুত্ব দেয়।
৬। উলরিখ বেক (Ulrich Beck): আধুনিক সমাজে প্রযুক্তি ও শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা মানুষের তৈরি। (“Modern society produces new risks through technological and industrial development.”) এই ধারণা অনুযায়ী, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অনেক সময় নতুন ধরনের মানব সৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৭। ব্যারি টার্নার (Barry Turner): মানব সৃষ্ট বিপর্যয় সাধারণত দীর্ঘদিনের ভুল, অব্যবস্থাপনা ও সতর্কতার অভাবের ফল হিসেবে সৃষ্টি হয়। (“Disasters often emerge from a combination of human errors, organizational failures and neglected warnings.”) এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, বিপর্যয় হঠাৎ সৃষ্টি হলেও এর পেছনে অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি ভুল ব্যবস্থাপনা কাজ করে।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, মানব সৃষ্ট বিপর্যয় হলো মানুষের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ড, ভুল সিদ্ধান্ত, অব্যবস্থাপনা ও অসতর্কতার ফলে সৃষ্ট এমন একটি ধ্বংসাত্মক ঘটনা, যা মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
উপসংহার: মানব সৃষ্ট বিপর্যয় মানুষের নিজস্ব কর্মকাণ্ডের ফল হওয়ায় সচেতনতা, সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আধুনিক সমাজে নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে মানব সৃষ্ট বিপর্যয় প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।