- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়। এই ধারার মাধ্যমে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা হলেও এর ফলে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
সংবিধানের ৭০ ধারার পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি:
১। দলীয় শৃঙ্খলা: সংবিধানের ৭০ ধারা সংসদ সদস্যদের নিজ দলের সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতে বাধ্য করে। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় এবং সরকার পরিচালনায় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সদস্যরা ইচ্ছামতো অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন না, যা সংসদীয় ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২। সরকার স্থায়িত্ব: ৭০ ধারার কারণে সরকার পতনের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম থাকে। সংসদ সদস্যরা দল পরিবর্তন বা আস্থা ভোটে বিরোধিতা করতে না পারায় নির্বাচিত সরকার নির্ধারিত মেয়াদে কাজ করার সুযোগ পায়। এর ফলে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
৩। রাজনৈতিক স্থিরতা: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ৭০ ধারা সংসদ সদস্যদের দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ সীমিত করে। ফলে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের আশঙ্কা কমে এবং রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে একটি ধারাবাহিক পরিবেশ বজায় থাকে।
৪। দলীয় বিশ্বাস: সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। ৭০ ধারা সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী ইশতেহার ও দলের ঘোষিত নীতির প্রতি দায়বদ্ধ রাখে। জনগণ সাধারণত কোনো দলের প্রতীক দেখে ভোট দেয়, তাই নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন দলের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হন, তা নিশ্চিত করার যুক্তি হিসেবে এই ধারাকে দেখা হয়।
৫। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ: এই ধারার সমর্থকদের মতে, ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বার্থে দলবিরোধী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ কমায়। এর ফলে অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে সরকার পরিবর্তনের মতো অনৈতিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় এবং সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
৬। সংসদীয় কার্যক্রম: ৭০ ধারা সংসদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সহজ করে। দলীয় ঐক্য থাকার কারণে আইন প্রণয়ন ও সরকারি কার্যক্রম পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমে। সরকার তার নীতিমালা বাস্তবায়নে সংসদীয় সমর্থন পায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
৭। জনগণের ম্যান্ডেট: এই ধারার পক্ষে যুক্তি হলো, নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দল যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে, তা বাস্তবায়নের জন্য দলীয় ঐক্য প্রয়োজন। সংসদ সদস্যরা যদি নিয়মিতভাবে দলের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন, তাহলে জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেট দুর্বল হতে পারে। তাই দলীয় সিদ্ধান্ত মানাকে জনগণের প্রত্যাশার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৮। গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা: ৭০ ধারার অন্যতম সমালোচনা হলো এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন চিন্তা ও মত প্রকাশের সুযোগ সীমিত করে। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি জনগণের স্বার্থে কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেও দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে তা প্রকাশ করতে বাধাগ্রস্ত হতে পারেন। এতে সংসদের কার্যকর আলোচনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৯। সাংসদ স্বাধীনতা: সংসদ সদস্যরা জনগণের সরাসরি প্রতিনিধি হলেও ৭০ ধারা তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সংকুচিত করে বলে সমালোচকরা মনে করেন। সংসদে আইন ও নীতির বিষয়ে মুক্ত আলোচনা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু দলীয় অবস্থানের কারণে অনেক সদস্য নিজের মত প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে পারেন।
১০। জবাবদিহি সমস্যা: এই ধারার কারণে সরকার ও মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের ওপর সংসদীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। কারণ সরকারি দলের সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সরকারের ভুল বা দুর্বলতার সমালোচনা করতে অনাগ্রহী হতে পারেন। এতে সংসদ কার্যকরভাবে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ভূমিকা হারাতে পারে।
১১। বিরোধী মত: গণতন্ত্রে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৭০ ধারার সমালোচকদের মতে, এই বিধান সংসদের ভেতরে গঠনমূলক বিরোধিতা কমিয়ে দেয়। সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময় জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সমালোচনা বা সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন।
১২। ক্ষমতার ভারসাম্য: একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। সমালোচকদের মতে, ৭০ ধারা সংসদকে নির্বাহী বিভাগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় দুর্বল করে। কারণ সরকারি দলের সদস্যরা সাধারণত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন না, ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
১৩। সংসদীয় সংস্কার: অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ৭০ ধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হলে সংসদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সংবিধান সংশোধন বা নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে দলীয় শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
১৪। দলত্যাগ রোধ: ৭০ ধারার একটি প্রধান উদ্দেশ্য হলো নির্বাচিত সদস্যদের দল পরিবর্তনের প্রবণতা বন্ধ করা। এই বিধান না থাকলে ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলের সদস্যরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য দল পরিবর্তন করতে পারেন বলে আশঙ্কা থাকে। তাই রাজনৈতিক নৈতিকতা বজায় রাখার জন্য এই ধারার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
১৫। জনগণের প্রতিনিধিত্ব: সমালোচকদের মতে, সংসদ সদস্যের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু ৭০ ধারার কারণে অনেক সময় জনগণের মতামতের পরিবর্তে দলীয় নির্দেশকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। ফলে জনগণের সরাসরি প্রতিনিধিত্বের ধারণা কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৬। গণতান্ত্রিক বিকাশ: বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের ক্ষেত্রে ৭০ ধারা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এর মাধ্যমে যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, তেমনি সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। তাই ধারাটির প্রয়োগে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
১৭। ভারসাম্য প্রয়োজন: সংবিধানের ৭০ ধারা সম্পূর্ণভাবে বাতিল বা অপরিবর্তিত রাখার পরিবর্তে এর প্রয়োগ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের যুক্তিসংগত মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা হলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হতে পারে।
উপসংহার: সংবিধানের ৭০ ধারা বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় দলীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ ও সরকারের জবাবদিহির ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। তাই গণতন্ত্রের স্বার্থে দলীয় শৃঙ্খলা ও সংসদীয় স্বাধীনতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।