- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- সন্ত্রাসবাদ কী?
Or, সন্ত্রাসবাদ কাকে বলে?
Or, সন্ত্রাসবাদের সজ্ঞা দাও।
Or, সন্ত্রাসবাদ বলতে কি বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: সন্ত্রাসবাদ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সমস্যা। এটি শুধু ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর ওপর আক্রমণ নয়, বরং সমাজের শান্তি, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে। ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক, আদর্শিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের প্রচেষ্টাই সন্ত্রাসবাদের মূল বৈশিষ্ট্য।
সন্ত্রাসবাদের পরিচয়:-
সন্ত্রাসবাদ হলো এমন একটি পরিকল্পিত সহিংস কর্মকাণ্ড, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিজেদের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য পূরণ করতে চায়। সন্ত্রাসবাদ সাধারণত বেসামরিক জনগণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আক্রমণের মাধ্যমে সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। এটি একটি অপ্রচলিত নিরাপত্তা হুমকি, যা রাষ্ট্রীয় সীমারেখা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ- এর শাব্দিক অর্থ:- সন্ত্রাসবাদ শব্দটি ইংরেজি “Terrorism” শব্দের বাংলা রূপ। “Terror” অর্থ হলো ভয়, আতঙ্ক বা ভীতি এবং “ism” অর্থ হলো কোনো মতবাদ বা পদ্ধতি। অর্থাৎ ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের মতবাদ বা পদ্ধতিকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয়।
১। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): সন্ত্রাসবাদ হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বেআইনিভাবে সহিংসতা ও ভয় প্রদর্শনের ব্যবহার। (“The unlawful use of violence and intimidation, especially against civilians, in the pursuit of political aims.”) এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যায় যে, সন্ত্রাসবাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সহিংসতা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা।
২। জাতিসংঘ (United Nations – UN): সন্ত্রাসবাদ হলো এমন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, যার উদ্দেশ্য সাধারণ জনগণ বা কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা এবং কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শিক লক্ষ্য অর্জন করা। (“Criminal acts intended or calculated to provoke a state of terror in the general public, a group of persons or particular persons for political purposes.”) এই ধারণা অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদ মূলত ভয় সৃষ্টি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্দেশ্য অর্জনের একটি সহিংস পদ্ধতি।
৩। ব্রুস হফম্যান (Bruce Hoffman): সন্ত্রাসবাদ হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা বা সহিংসতার হুমকি ব্যবহার করার একটি পদ্ধতি। (“Terrorism is the deliberate creation and exploitation of fear through violence or the threat of violence in the pursuit of political change.”) এই সংজ্ঞা সন্ত্রাসবাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও ভয় সৃষ্টির কৌশলকে তুলে ধরে।
৪। ওয়াল্টার লাকুর (Walter Laqueur): সন্ত্রাসবাদ হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সহিংসতা ও ভয়কে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। (“Terrorism constitutes the illegitimate use of force to achieve a political objective when innocent people are targeted.”) এই ধারণা অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদে সাধারণত নিরপরাধ মানুষও ক্ষতির শিকার হয়।
৫। অ্যালেক্স পি. স্মিড (Alex P. Schmid): সন্ত্রাসবাদ হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে ভয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করা হয়। (“Terrorism is a method of repeated violent action that creates fear among a target audience.”) এই সংজ্ঞা সন্ত্রাসবাদের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়।
৬। চার্লস টিলি (Charles Tilly): সন্ত্রাসবাদ হলো ভয় সৃষ্টি ও সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন আনার একটি কৌশল। (“Terror is a strategy of using fear and violence to influence political outcomes.”) এই ধারণা থেকে বোঝা যায় যে, সন্ত্রাসবাদ শুধু সহিংসতা নয়; বরং একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ কৌশল।
৭। জেসিকা স্টার্ন (Jessica Stern): সন্ত্রাসবাদ হলো ভয়কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা। (“Terrorism is an act of violence designed to create fear and influence behavior.”) এই সংজ্ঞা সন্ত্রাসবাদের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে ভয় সৃষ্টি ও আচরণ পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, সন্ত্রাসবাদ হলো এমন একটি পরিকল্পিত সহিংস মতবাদ বা কার্যক্রম, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা সংগঠন ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতা ব্যবহার করে রাজনৈতিক, আদর্শিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের চেষ্টা করে এবং যা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে।
উপসংহার: সন্ত্রাসবাদ আধুনিক বিশ্বের একটি গুরুতর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। এটি মানুষের জীবন, শান্তি ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত প্রয়োজন।