- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- স্নায়ুযুদ্ধ কী?
Or, স্নায়ুযুদ্ধ কাকে বলে?
Or, স্নায়ুযুদ্ধের সজ্ঞা দাও।
Or, স্নায়ুযুদ্ধ বলতে কি বুঝ?
উত্তর::ভূমিকা: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক ধরনের উত্তেজনার সৃষ্টি হয়, যেখানে সরাসরি সামরিক যুদ্ধের পরিবর্তে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক প্রতিযোগিতা প্রধান হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ নামে পরিচিত। এটি বিশ্ব রাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
স্নায়ুযুদ্ধের পরিচয়:-
স্নায়ুযুদ্ধ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী জোট এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক জোটের মধ্যে সংঘটিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এ যুদ্ধে দুই পক্ষ সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘর্ষে জড়ায়নি; বরং অস্ত্র প্রতিযোগিতা, কূটনৈতিক চাপ, গোয়েন্দা কার্যক্রম, প্রচারণা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পর্যন্ত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল।
স্নায়ুযুদ্ধ- এর শাব্দিক অর্থ:- স্নায়ুযুদ্ধ শব্দটি ইংরেজি “Cold War” শব্দের বাংলা রূপ। “Cold” অর্থ হলো ঠান্ডা বা শীতল এবং “War” অর্থ হলো যুদ্ধ। অর্থাৎ যে যুদ্ধ সরাসরি অস্ত্রের মাধ্যমে সংঘটিত না হয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরিচালিত হয় তাকে স্নায়ুযুদ্ধ বলা হয়।
১। ওয়াল্টার লিপম্যান (Walter Lippmann): স্নায়ুযুদ্ধ হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে দুটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। (“The Cold War is a struggle between two great powers without direct military conflict.”) এই ধারণা থেকে বোঝা যায় যে, স্নায়ুযুদ্ধের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল প্রত্যক্ষ যুদ্ধের পরিবর্তে পরোক্ষ সংঘাত।
২। রেমন্ড অ্যারন (Raymond Aron): স্নায়ুযুদ্ধ হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে যুদ্ধ অসম্ভব নয়, কিন্তু শান্তিও স্বাভাবিক নয়। (“The Cold War is a state of tension in which peace is impossible and war is improbable.”) এই সংজ্ঞা স্নায়ুযুদ্ধের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থাকে তুলে ধরে।
৩। জর্জ অরওয়েল (George Orwell): স্নায়ুযুদ্ধ হলো এমন একটি পরিস্থিতি, যেখানে দুটি শক্তিশালী পক্ষ ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের ভয়ে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত থাকে। (“A permanent state of war without direct fighting.”) এই ধারণা স্নায়ুযুদ্ধের অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভয়ভিত্তিক রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করে।
৪। জন লুইস গ্যাডিস (John Lewis Gaddis): স্নায়ুযুদ্ধ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা। (“The Cold War was a long peace between the United States and the Soviet Union shaped by ideological and geopolitical rivalry.”) এই ব্যাখ্যা স্নায়ুযুদ্ধের আদর্শিক ও ভূ-রাজনৈতিক দিক তুলে ধরে।
৫। হেনরি কিসিঞ্জার (Henry Kissinger): স্নায়ুযুদ্ধ ছিল দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক ব্যবস্থার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রতিযোগিতা। (“The Cold War was a struggle for power and influence between competing ideological systems.”) এই ধারণা আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে।
৬। কেনেথ ওয়াল্টজ (Kenneth Waltz): স্নায়ুযুদ্ধ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় দুটি প্রধান শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি উদাহরণ ছিল। (“The Cold War reflected a bipolar balance of power in the international system.”) এই সংজ্ঞা স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে।
৭। আর্নল্ড টয়েনবি (Arnold Toynbee): স্নায়ুযুদ্ধ আধুনিক বিশ্বের রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনের প্রতিফলন ছিল, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দীর্ঘ সময় প্রভাবিত করেছে। (“The Cold War represented a major ideological conflict shaping modern international relations.”) এই ধারণা স্নায়ুযুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাবকে নির্দেশ করে।
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, স্নায়ুযুদ্ধ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে চলা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত না হলেও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও কূটনৈতিক সংঘাত অব্যাহত ছিল।
উপসংহার: স্নায়ুযুদ্ধ বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি বিশ্বকে দুই প্রধান শক্তি ও দুটি আদর্শিক শিবিরে বিভক্ত করেছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করেছে। যদিও স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে, তবুও এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এখনও বিদ্যমান।