- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আইয়ুব খান পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি গণতান্ত্রিক ধারাকে অবদমিত করে নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন। ১৯৬২ সালের ১লা মার্চ এই সংবিধান ঘোষিত হয় এবং ৮ই জুন থেকে এটি কার্যকর হয়, যা ছিল মূলত একটি একনায়কতান্ত্রিক দলিল।
১৯৬২ সালের সংবিধানের বৈশিষ্ট্য সমূহ:
১। রাষ্ট্রীয় নাম: ১৯৬২ সালের সংবিধানে প্রথমাবস্থায় দেশটির নাম রাখা হয়েছিল কেবল ‘প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান’। এই নামের মধ্য থেকে পূর্বের সংবিধানে থাকা ‘ইসলামী’ শব্দটি সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। এর ফলে তৎকালীন মুসলিম সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়া এবং অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তীব্র গণ-আপত্তির মুখে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রী পাকিস্তান’ নামটি ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
২। প্রেসিডেন্ট শাসিত: এই সংবিধানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এতে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের যাবতীয় নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। ফলে মন্ত্রীপরিষদ তাদের কাজের জন্য আইনসভার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য ছিল না। তারা পুরোপুরি রাষ্ট্রপতির অনুগত এবং তাঁর ইচ্ছাধীন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতেন।
৩। এককক্ষ বিশিষ্ট: ১৯৬২ সালের সংবিধানে কেন্দ্রে একটি মাত্র আইনসভার বিধান রাখা হয়েছিল যার নাম ছিল জাতীয় পরিষদ। এই আইনসভায় কোনো উচ্চকক্ষ বা দ্বিতীয় কোনো কক্ষের অস্তিত্ব ছিল না। জাতীয় পরিষদের মোট আসন সংখ্যা ছিল ১৫৬টি, যেখানে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই এককক্ষ বিশিষ্ট পরিষদই প্রধান ভূমিকা পালন করত।
৪। পরোক্ষ নির্বাচন: এই সংবিধানের মাধ্যমে দেশে এক অভিনব ও বিতর্কিত পরোক্ষ নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। সাধারণ জনগণের সরাসরি ভোটে দেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হতেন না। নাগরিকরা প্রথমে মৌলিক গণতন্ত্রের আশি হাজার সদস্যকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন। পরবর্তীতে এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রপতি এবং আইনসভার সদস্যদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতেন।
৫। ইসলামী ধারা: সংবিধানে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে ইসলামকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে কোনো আইন যাতে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী না হয়, তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি ‘ইসলামী মতাদর্শ কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হয়। যদিও এই কাউন্সিলের পরামর্শ গ্রহণ করা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক বা আবশ্যকীয় ছিল না।
৬। মৌলিক অধিকার: এই সংবিধানের মূল দলিলে জনগণের মৌলিক অধিকারের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। আইয়ুব খান মনে করতেন যে তৎকালীন পাকিস্তানের জনগণের জন্য মৌলিক অধিকারের চেয়েও স্থায়িত্ব বেশি জরুরি। ফলে আদালতের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আদায়ের কোনো সুযোগ এই সংবিধানে রাখা হয়নি। পরবর্তীতে প্রচণ্ড রাজনৈতিক চাপ ও আন্দোলনের মুখে সংশোধনীর মাধ্যমে এটি যুক্ত করতে বাধ্য হন।
৭। প্রেসিডেন্টের ভেটো: আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিষদের ওপর প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ও চরম ভেটো প্রদানের ক্ষমতা বলবৎ ছিল। জাতীয় পরিষদ কোনো বিল পাস করলেও প্রেসিডেন্ট তাতে সম্মতি দিতে অস্বীকার করতে পারতেন। এমনকি পরিষদ যদি দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে পুনরায় সেই বিল পাস করত, তবুও তিনি তা জনগণের গণভোটে পাঠাতে পারতেন। এই ব্যবস্থার কারণে আইনসভা মূলত একটি ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছিল।
৮। জরুরি অবস্থা: দেশে যেকোনো সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার একচ্ছত্র এবং অবাধ ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছিল। দেশের নিরাপত্তা কিংবা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে তিনি এই বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারতেন। জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়ে তিনি যেকোনো অধ্যাদেশ জারি করতে পারতেন যা আইনের সমান কার্যকর হতো। এই সময়ে মৌলিক অধিকারের কার্যকারিতা পুরোপুরি স্থগিত রাখার বিধান সংবিধানে ছিল।
৯। প্রাদেশিক সরকার: এই সংবিধানে কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে ক্ষমতা বণ্টনের কথা বলা হলেও কার্যত কোনো স্বায়ত্তশাসন ছিল না। প্রাদেশিক গভর্নররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হতেন এবং তাঁর অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থাকতেন। প্রাদেশিক মন্ত্রীরা গভর্নরের কাছে দায়ী থাকতেন, যিনি আবার প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ পরিচালনা করতেন। ফলে প্রাদেশিক সরকারগুলো কেন্দ্রের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল।
১০। বিচার বিভাগের: সংবিধানে একটি সর্বোচ্চ আদালত বা সুপ্রিম কোর্ট গঠনের বিধান রাখা হয়েছিল যা বিচার ব্যবস্থার শীর্ষে ছিল। প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারপতিগণ সরাসরি দেশের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। তবে এই বিচার বিভাগকে শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বা মুক্ত রাখা হয়নি। আইনসভার পাস করা কোনো আইনকে অবৈধ ঘোষণা করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ছিল না।
১১। কঠিন সংশোধন: ১৯৬২ সালের এই সংবিধান পরিবর্তনের বা সংশোধনের পদ্ধতি অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন করা হয়েছিল। সংবিধানের যেকোনো ধারা সংশোধন করতে হলে জাতীয় পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটের প্রয়োজন হতো। এরপর সেই সংশোধনী বিলটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হতো। প্রেসিডেন্ট সম্মতি না দিলে তা পুনরায় তিন-চতুর্থাংশ ভোটে পাস করাতে হতো, যা ছিল অসম্ভব।
১২। রাজনৈতিক দল: এই সংবিধানের একটি অন্যতম বিতর্কিত দিক ছিল এতে রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আইয়ুব খান বিশ্বাস করতেন যে রাজনৈতিক দলগুলো দেশে বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই সংবিধানের মূল কাঠামোতে দলবিহীন শাসনব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য বাস্তবতার নিরিখে ১৯৬২ সালের শেষদিকে দল বিধি আইন পাস করে দল পুনরুজ্জীবিত করা হয়।
১৩। রাজধানী নির্ধারণ: সংবিধানে পাকিস্তানের নতুন প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদকে নির্ধারণ করা হয়। তবে বাঙালি তথা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করার জন্য একটি চতুর কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। সেই কৌশল অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকাকে দেশের দ্বিতীয় বা আইনসভা রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই দ্বৈত রাজধানী নীতি বাঙালি সমাজকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
১৪। রাষ্ট্রভাষা নীতি: ১৯৫৬ সালের সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এই সংবিধানেও বাংলা ও উর্দুকে সমমর্যাদা দেওয়া হয়। এই দুটি ভাষাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছিল। একই সাথে ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। যতদিন না বাংলা ও উর্দু পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন ইংরেজি ব্যবহারের বিধান ছিল।
১৫। গণভোটের ব্যবস্থা: প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় পরিষদের মধ্যে কোনো বিষয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিলে গণভোটের বিধান রাখা হয়েছিল। যদি কোনো বিল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হতো, তবে প্রেসিডেন্ট সেটি মৌলিক গণতন্ত্রী ভোটারদের কাছে পাঠাতে পারতেন। ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে সেই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতো। এই ব্যবস্থাটি মূলত প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার ছিল।
১৬। অভিশংসন পদ্ধতি: সংবিধানে প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে অপসারিত করার বা অভিশংসনের একটি অত্যন্ত জটিল নিয়ম রাখা হয়েছিল। প্রেসিডেন্টকে সরাতে হলে জাতীয় পরিষদের মোট সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের নোটিশের প্রয়োজন হতো। এরপর মোট সদস্যের অন্তত তিন-চতুর্থাংশ বা ৭৫ শতাংশ ভোটের মাধ্যমে প্রস্তাবটি পাস হতে হতো। যদি এই প্রস্তাব ব্যর্থ হতো, তবে প্রস্তাবকারী সদস্যদের আসন বাতিল হয়ে যেত।
১৭। অর্থনৈতিক বৈষম্য: এই সংবিধানে দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। এই কাউন্সিলের দায়িত্ব ছিল দেশের উভয় অংশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে সাংবিধানিক এই সান্ত্বনা কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছিল।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, ১৯৬২ সালের সংবিধান ছিল মূলত একজন সামরিক শাসকের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার একটি আইনি হাতিয়ার। এতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে প্রেসিডেন্টের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল। এই কৃত্রিম শাসনব্যবস্থা বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। ফলশ্রুতিতে তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে এই সংবিধানের চূড়ান্ত পতন ঘটে।