- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামে এক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এই ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। রাজনৈতিক দলগুলোর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্তই মূলত মুক্তিকামী জনতাকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা আলোচনা:
১। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করে। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার গঠন করে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। দেশ-বিদেশের সমর্থন আদায় এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিল।
২। মুজিবনগর সরকার গঠন: মুক্তিযুদ্ধকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক রূপ দিতে আওয়ামী লীগ নেতারা ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করেন। ১৭ এপ্রিল এই সরকারের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এই সরকারই বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বৈধতার প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
৩। ন্যাপের (মোজাফফর) অবদান: অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) মহান মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তারা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন। ন্যাপের নেতা-কর্মীরা সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন এবং সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমর্থন আদায়ে এই দলের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
৪। ন্যাপের (ভাসানী) ভূমিকা: মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। মওলানা ভাসানী নিজে ভারত সফর করে বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো আকুতি জানান। তাঁর অনুসারীরা দেশের ভেতরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন।
৫। কমিউনিস্ট পার্টির অংশগ্রহণ: মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। এই দলের অসংখ্য নেতাকর্মী ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক স্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের জোরালো সমর্থন আদায়ের পেছনে সিপিবির ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল। তারা দেশের ভেতরেও বামপন্থী যুবকদের যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করে।
৬। বিশেষ গেরিলা বাহিনী: ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। প্রায় বিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধার এই বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে ক্র্যাক প্লাটুন ও অন্যান্য গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে। তারা দেশের অভ্যন্তরে শত্রুঘাঁটি ধ্বংস এবং পাকিস্তানি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। এই বাহিনীর রণকৌশল ও সাহসিকতা পাকিস্তানি বাহিনীকে চরম বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।
৭। সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি: যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী) ও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়েছিল। তাজউদ্দীন আহমদের উদ্যোগে গঠিত এই কমিটি মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
৮। বামপন্থী দলগুলোর রণকৌশল: মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট ছোট বামপন্থী দলও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিল। কিছু অতি-বামপন্থী দল তত্ত্বগত দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলেও সিংহভাগ বামপন্থী কর্মী দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। তারা গ্রামীণ এলাকায় সাধারণ কৃষকদের সংগঠিত করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। স্থানীয় পর্যায়ে শত্রু নির্মূল এবং নিজেদের এলাকা মুক্ত রাখতে তারা অনন্য অবদান রাখেন।
৯। জাতীয় লীগের সমর্থন: আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছিল। সামরিক জান্তার ভয়ে পিছপা না হয়ে এই দলের শীর্ষ নেতারা স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন জানান। দলীয় কর্মীরা বিভিন্ন সেক্টরে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবেলা করেন। জাতীয় ঐক্যমত্য গঠনে এই ধরনের মাঝারি রাজনৈতিক দলগুলোর নৈতিক সমর্থন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।
১০। ছাত্র সংগঠনগুলোর ভূমিকা: তৎকালীন প্রধান ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যেমন ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি ছিল। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছাত্র সমাজকে প্রথম থেকে সংগঠিত করে আসছিল। যুদ্ধ শুরু হলে এই ছাত্র নেতারাই বীরত্বের সাথে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের একটা বিশাল অংশই এসেছিল এই প্রগতিশীল ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলো থেকে।
১১। মুসলিম লীগের বিরোধিতা: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকা পালনকারী দলগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান ছিল মুসলিম লীগ। কাইয়ুম পন্থী, কনভেনশন ও কাউন্সিল মুসলিম লীগ সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার চরম বিরোধিতা করে। তারা অখণ্ড পাকিস্তানের নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রতিটি নৃশংস কর্মকাণ্ডকে সরাসরি সমর্থন দিয়েছিল। এই দলের নেতাকর্মীরাই দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাতে পাকিস্তানি সেনাদের পথ দেখিয়েছিল।
১২। জামায়াতে ইসলামীর অপতৎপরতা: জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সবচেয়ে ঘৃণ্য ও কলঙ্কজনক ভূমিকা পালন করে। তারা শুধু রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেনি, বরং পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি সাহায্য করেছিল। তাদের নেতৃত্বে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের মতো কুখ্যাত সহযোগী বাহিনী গঠিত হয়। এই দলটির পরিকল্পনায় বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যা ও দেশজুড়ে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল।
১৩। নেজামে ইসলামের ভূমিকা: ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নেজামে ইসলামও মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা স্বাধীনতার আন্দোলনকে ইসলাম বিরোধী বলে প্রচার করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম চালায়। মুক্তিবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ্য করা এবং পাকিস্তানি সেনাদের কাছে তথ্য পাচার করাই ছিল এদের মূল কাজ।
১৪। পিডিপির নেতিবাচক অবস্থান: নুরুল আমিনের নেতৃত্বাধীন প্রিল চয়েস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি) মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিল। নুরুল আমিন নিজে পাকিস্তানি জান্তার সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেন। তিনি পরবর্তীতে যুদ্ধকালীন সময়ে গঠিত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পুতুল সরকারের প্রধানমন্ত্রী পদ গ্রহণ করেছিলেন। দলটির এই দেশবিরোধী অবস্থান বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত।
১৫। শান্তি কমিটি গঠন: জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য ডানপন্থী দলগুলো মিলে দেশজুড়ে ‘কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটির প্রধান কাজ ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতকে শক্তিশালী করা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের দমন করা। তারা প্রতিটি জেলা ও থানায় শাখা খুলে মুক্তিকামী মানুষের তালিকা তৈরি করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিত। দেশের অভ্যন্তরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে এই শান্তি কমিটি মূল ভূমিকা রাখে।
১৬। রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতা: রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ায় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে রাজাকার বাহিনী গঠিত হয়। প্রধানত মুসলিম লীগ ও জামায়াতের উগ্র কর্মীরা এই বাহিনীতে যোগ দিয়ে গ্রামে-গঞ্জে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নারী নির্যাতন চালায়। তারা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান সনাক্ত করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত। দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালানোর ক্ষেত্রে এই বাহিনী ছিল যমদূত।
১৭। আল-বদর ও বুদ্ধিজীবী হত্যা: জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে কুখ্যাত আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়েছিল। এই বাহিনীটি ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘাতক চক্র। যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে তারা দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৪ ডিসেম্বরের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড এই রাজনৈতিক অপশক্তির সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের ফসল ছিল।
শেষকথা: পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল দ্বিবিধ ও বিপরীতমুখী। একদিকে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির মতো প্রগতিশীল দলগুলো বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে দীক্ষিত করে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। অন্যদিকে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী হয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে লিপ্ত হয়েছিল। তবে সমস্ত অপশক্তিকে পরাজিত করে রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও আপামর জনতার আত্মত্যাগের মাধ্যমেই অর্জিত হয় আমাদের লাল-সবুজ পতাকা।