- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের চিন্তাধারা আজও বিশ্বকে আলোকিত করে চলেছে, বিশেষ করে তার যুক্তিতন্ত্র বা লজিকের ক্ষেত্রে। তার মধ্য তন্ত্র নামক ধারণাটি যুক্তির ভিত্তি স্থাপন করে, যা আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা ও বিজ্ঞানীয় অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারণা বোঝার মাধ্যমে আমরা যুক্তির গভীরতা অনুভব করতে পারি। এখানে আমরা এর সহজ পরিচয় দিব।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার ‘মধ্য তন্ত্র’ বা ‘পলিটি’-এর ধারণা। প্লেটোর ছাত্র হলেও অ্যারিস্টটল গুরুর মতো কাল্পনিক আদর্শ রাষ্ট্রের পরিবর্তে বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের সব সমস্যার সমাধান চরমপন্থায় নয়, বরং মধ্যপন্থায় নিহিত। এই দর্শন কেবল নীতিবিদ্যাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা নিয়েও তিনি একই ধারণা পোষণ করতেন। অ্যারিস্টটলের মতে, একটি স্থিতিশীল ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রের জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসনই সবচেয়ে উপযুক্ত।
অ্যারিস্টটলের ‘মধ্য তন্ত্র’ হলো এক ধরনের শাসনব্যবস্থা, যা ধনী ও গরিব উভয় শ্রেণির চরমপন্থার ভারসাম্য রক্ষা করে। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পলিটিক্স’-এ সরকারের শ্রেণিবিভাগ করতে গিয়ে এই ধারণার অবতারণা করেন। অ্যারিস্টটল রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র এবং পলিটিকে (মধ্য তন্ত্র) ভালো শাসনব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর বিপরীত তিনটি বিকৃত রূপ হলো স্বৈরতন্ত্র, ধনিকতন্ত্র এবং গণতন্ত্র।
অ্যারিস্টটলের মতে, একটি রাষ্ট্রে যখন কেবল ধনীরা শাসন করে (ধনিকতন্ত্র), তখন তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য গরিবদের উপর শোষণ চালায়, যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। আবার যখন কেবল গরিবরা শাসন করে (গণতন্ত্র), তখন তারা ধনীদের উপর নিপীড়ন চালায়, যা এক ধরনের বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। অ্যারিস্টটল বিশ্বাস করতেন যে এই দুটি চরমপন্থাই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
তিনি এই সমস্যা সমাধানের জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসনের (পলিটি) ধারণা দেন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি ধনী ও গরিবের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। তারা অত্যধিক ধনীও নয়, আবার একেবারে গরিবও নয়। তাই তারা ধনীদের মতো শোষক হয় না, আবার গরিবদের মতোও প্রতিশোধপরায়ণ হয় না। এই শ্রেণি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। অ্যারিস্টটলের মতে, যেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণি শক্তিশালী, সেখানে সমাজ বৈষম্য ও সংঘাতমুক্ত থাকে। এই শাসনব্যবস্থায় ধনী ও গরিব উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হয় এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ সাধিত হয়।
উপসংহার: অ্যারিস্টটলের ‘মধ্য তন্ত্র’ ধারণাটি আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এটি সমাজের ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতার উপর জোর দেয়। চরমপন্থার পরিবর্তে মধ্যপন্থা অবলম্বন করার এই দর্শন কেবল রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, বরং নৈতিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। তার মতে, একটি সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্রের জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির শক্তিশালী উপস্থিতি অপরিহার্য।
অ্যারিস্টটলের ‘মধ্য তন্ত্র’ হলো এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা, যা ধনী ও দরিদ্রের চরমপন্থার বদলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির শাসনের উপর ভিত্তি করে গঠিত।
অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) তার ‘নিকোমাচিয়ান এথিক্স’ গ্রন্থে নৈতিকতার ক্ষেত্রেও ‘গোল্ডেন মিন’ বা মধ্যম নীতির ধারণা দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, সাহস হলো ভীরুতা ও বেপরোয়া ভাব-এর মাঝামাঝি একটি গুণ। এই নীতিটি খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের দিকে ইহুদি ধর্মীয় নেতা মাইমোনাইডেসের লেখায়ও প্রতিফলিত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ইসলামী ও পশ্চিমা দর্শনেও প্রভাব ফেলে।

