- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল দীর্ঘদিনের সংকট। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও গণতন্ত্রের অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ফলে দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তি ও জনপ্রিয়তা ক্রমশ ক্ষয় হচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চরিত্র ও কারণ আলোচনা
১। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব: বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলেই নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকট। একজন শীর্ষ নেতা দলকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন, ফলে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে ওঠে না। দীর্ঘদিন একই নেতৃত্ব থাকায় তৃণমূলে নতুন নেতা তৈরি হয় না। ফলে যোগ্য নেতাদের মধ্যে ক্ষোভ জমে দলীয় কোন্দলে রূপ নেয়।
২। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা: দলগুলো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ব্যক্তির রাজনৈতিক বাহনে পরিণত হয়েছে। নেতার ব্যক্তিত্বের আড়ালে দলের নীতি, আদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামো হারিয়ে যাচ্ছে। নেতা ভালো, দল খারাপ—এই বয়ানই তার প্রমাণ। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কারণে দলে জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হয়।
৩। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব: বড় দলগুলোর অভ্যন্তরে প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন ও নীতি নির্ধারণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ নেই। শীর্ষ নেতৃত্বের একচ্ছত্র সিদ্ধান্তে সাধারণ কর্মীরা উপেক্ষিত। ফলে দলের ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমে কোন্দলের সৃষ্টি হয়।
৪। উপদলীয় কোন্দল: প্রতিটি বড় দলে একাধিক উপদল বা গ্রুপ সক্রিয়। স্থানীয় নেতা, সংসদ সদস্য ও পুরোনো নেতাদের আলাদা গোষ্ঠী থাকে। প্রত্যেকে নিজেদের অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চায়। এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় প্রকাশ্য সংঘর্ষ ও হানাহানিতে রূপ নেয়।
৫। স্বচ্ছতার অভাব: দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব প্রকট। কমিটি গঠন, পদ বণ্টন ও আর্থিক বিষয়ে জবাবদিহি নেই। স্বচ্ছতার অভাবে নেতাকর্মীরা নিজেদের অবহেলিত মনে করে। ফলে পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস বেড়ে দলীয় ঐক্য ভেঙে পড়ে।
৬। দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি: দলীয় পদ ও সুযোগ-সুবিধা বিতরণে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সাধারণ। প্রভাবশালী নেতারা নিজেদের আত্মীয় ও অনুগতদের সুবিধা দেন। এতে যোগ্য ও পরিশ্রমী কর্মীরা পিছিয়ে পড়েন। এই বৈষম্য দলীয় কোন্দলকে আরও উসকে দেয়।
৭। গ্রুপিং: দলে গ্রুপিং এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। নিজ গ্রুপকে শক্তিশালী করতে অনুগতদের সুযোগ দেওয়া হয়। যে গ্রুপ শক্তিশালী হয়, সে গ্রুপ অন্য গ্রুপকে দমিয়ে রাখতে চায়। ফলে পারস্পরিক হিংসা, মবিং ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বাড়ছে।
৮। প্রভাব বিস্তারের লড়াই: দলীয় অফিস, কমিটি ও স্থানীয় প্রভাব নিয়ে নেতাদের মধ্যে লড়াই চলছে। কে কোন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করবে, তা নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এই লড়াইয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীরা জিম্মি হয়ে পড়েন। ফলে দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৯। নির্বাচনী টিকিট বিতর্ক: নির্বাচনে মনোনয়ন বিতরণকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি কোন্দল হয়। যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীকে বাদ দিয়ে অযোগ্যকে টিকিট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মনোনয়নবঞ্চিতরা বিদ্রোহী হয়ে দলের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এতে দলীয় ভোট বিভক্ত হয়ে পরাজয় নিশ্চিত হয়।
১০। তৃণমূল উপেক্ষা: তৃণমূল নেতাকর্মীদের দলীয় সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা থাকে না। কেন্দ্র থেকে সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাস্তবতা ও কর্মীদের মতামত উপেক্ষিত হয়। ফলে তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ে এবং কোন্দল সৃষ্টি হয়।
১১। আদর্শিক সংকট: দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক স্পষ্টতা কমে গেছে। ক্ষমতা ও সুবিধার লোভে আদর্শ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। নেতাকর্মীরা দলের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন। আদর্শিক সংকট ব্যক্তিগত স্বার্থের লড়াইকে বাড়িয়ে তুলছে।
১২। বিদ্রোহী প্রার্থী: দলীয় টিকিট না পেয়ে অনেক নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। তারা দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে ভোট বিভক্ত করেন। একই দলের দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দলীয় ভাবমূর্তি ও নির্বাচনী ফলাফল দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৩। জোট রাজনীতির প্রভাব: জোট রাজনীতিতে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দলগুলোর অভ্যন্তরে বিভেদ তৈরি হয়। কোনো দল বেশি আসন পেলে অন্য দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হন। জোটের সিদ্ধান্ত তৃণমূলের সাথে সমন্বয়হীন হলে কোন্দল বাড়ে। এতে জোটের ঐক্যও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
১৪। নেতাকর্মীর ক্ষোভ: দীর্ঘদিন দলের জন্য পরিশ্রম করেও স্বীকৃতি না পেয়ে নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। নতুন ও সুবিধাভোগীরা দলে ঢুকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেন। পুরোনো কর্মীদের অবহেলা দলীয় কোন্দলের বড় কারণ। এই ক্ষোভ অনেক সময় দল ত্যাগ বা বিদ্রোহে রূপ নেয়।
১৫। কমিটি গঠন বিতর্ক: কমিটি গঠন নিয়ে প্রায় সব দলেই বিতর্ক ও কোন্দল লেগেই থাকে। কে কোন পদ পাবে, তা নিয়ে গ্রুপিং ও লবিং চলতে থাকে। বহু স্থানে একাধিক কমিটির তালিকা তৈরি হয়। কমিটি গঠনের এই বিতর্ক দলীয় ঐক্যের জন্য বড় হুমকি।
১৬। কাউন্সিল বিলম্ব: বিভিন্ন দলের জাতীয় কাউন্সিল বছরের পর বছর অনুষ্ঠিত হয় না। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি নিয়েই দল চলতে থাকে। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তন ও নতুন নেতা তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। কাউন্সিল বিলম্ব দলীয় অসন্তোষ ও কোন্দলকে বাড়িয়ে তোলে।
১৭। জবাবদিহিহীনতা: দলীয় নেতাদের কাজের কোনো জবাবদিহিতা নেই। ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও কেউ জবাব দেয় না। জবাবদিহিহীনতার কারণে নেতারা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। ফলে দলের ভেতরে প্রতিবাদ ও অসন্তোষ জমে কোন্দলে রূপ নেয়।
উপসংহার: বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল মূলত নেতৃত্বের একচ্ছত্রতা, গণতন্ত্রের অভাব ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার ফসল। দলীয় সংস্কার না হলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে কোন্দল কমতে পারে। তৃণমূলের ক্ষোভ দূর করা গেলেই দলগুলো প্রকৃত জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।