- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণে উন্নত দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার, দুর্বল অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য তাদের এই নির্ভরশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তৃতীয় বিশ্বের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাবার কারণ:
১। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব: তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ দীর্ঘদিন ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে ছিল। ঔপনিবেশিক শাসকরা এসব দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করলেও স্থানীয় শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক কাঠামোর যথেষ্ট উন্নয়ন ঘটায়নি। এর ফলে স্বাধীনতার পরও অনেক দেশ অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও উন্নয়নের ঘাটতির কারণে উন্নত দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
২। দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো: তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর এবং শিল্পখাত তুলনামূলকভাবে দুর্বল। উৎপাদন ব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও বাজার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব দেশ নিজেদের উন্নয়নের জন্য বিদেশি সাহায্য, ঋণ ও বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
৩। প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা: আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ পিছিয়ে রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি অর্জন ও ব্যবহারের জন্য তাদের উন্নত দেশ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে সীমিত করে।
৪। বৈদেশিক ঋণের বৃদ্ধি: উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থনৈতিক ঘাটতি পূরণের জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশ থেকে ঋণ গ্রহণ করে। অতিরিক্ত বৈদেশিক ঋণের কারণে অনেক দেশ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ও দেশের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৫। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বৈষম্য: বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় উন্নত দেশগুলো অধিক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো সাধারণত কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য রপ্তানি করে এবং উন্নত দেশ থেকে তৈরি পণ্য আমদানি করে। এর ফলে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয় এবং নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পায়।
৬। শিল্পায়নের অভাব: তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে পর্যাপ্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শিল্পখাত দুর্বল হওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় পণ্য, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাধাগ্রস্ত হয়।
৭। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, সংঘাত ও সুশাসনের অভাব উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে এসব দেশ নিজেদের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিদেশি সাহায্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
৮। দক্ষ মানবসম্পদের অভাব: শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সীমাবদ্ধতার কারণে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি পরিচালনা ও আধুনিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ে।
৯। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরতা: অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশ উন্নয়ন প্রকল্প, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক কর্মসূচির জন্য বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন এই সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল থাকার ফলে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনের পথ অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
১০। বহুজাতিক কোম্পানির প্রভাব: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, মূলধন ও বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব বেশি থাকে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে।
১১। গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমাবদ্ধতা: তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে গবেষণা, বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। এর ফলে নতুন প্রযুক্তি ও জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষেত্রে তারা উন্নত দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
উপসংহার: তৃতীয় বিশ্বের নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক শোষণ, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক বৈষম্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে শিক্ষা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সুশাসনের মাধ্যমে এসব দেশ ধীরে ধীরে নির্ভরশীলতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে যেতে পারে।