- readaim.com
- 0
প্রশ্ন:- তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলতে কী বুঝ?
Or, তৃতীয় বিশ্বের দেশ কাকে বলে?
Or, তৃতীয় বিশ্বের দেশের সজ্ঞা দাও।
Or, তৃতীয় বিশ্বের দেশ কী?
উত্তর::ভূমিকা: বিশ্বের সব দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সমানভাবে উন্নত নয়। উন্নয়ন, সম্পদ, প্রযুক্তি ও জীবনযাত্রার মানের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উন্নয়নশীল ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশগুলোকে বোঝাতে “তৃতীয় বিশ্ব” ধারণার উদ্ভব হয়।
তৃতীয় বিশ্বের দেশের পরিচয়:
শাব্দিক অর্থ: “তৃতীয় বিশ্ব” শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। “তৃতীয়” অর্থ হলো তিন নম্বর বা তৃতীয় অবস্থান এবং “বিশ্ব” অর্থ হলো পৃথিবী বা আন্তর্জাতিক সমাজ। তাই শাব্দিক অর্থে তৃতীয় বিশ্ব বলতে বিশ্বের তৃতীয় কোনো অংশকে বোঝালেও রাজনৈতিক অর্থে এটি এমন দেশগুলোকে বোঝায়, যারা অর্থনৈতিকভাবে তুলনামূলকভাবে অনুন্নত এবং উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংগ্রাম করছে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশ: তৃতীয় বিশ্বের দেশ বলতে সাধারণত সেইসব উন্নয়নশীল দেশকে বোঝানো হয়, যেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এসব দেশের অধিকাংশই এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে অবস্থিত।
“তৃতীয় বিশ্ব” ধারণাটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত হয়। তখন প্রথম বিশ্ব বলতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী দেশগুলো এবং দ্বিতীয় বিশ্ব বলতে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে বোঝানো হতো। এদের বাইরে থাকা নিরপেক্ষ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তৃতীয় বিশ্ব বলা হতো।
১। আলফ্রেড সুভি (Alfred Sauvy): ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী আলফ্রেড সুভি ১৯৫২ সালে “Third World” শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর মতে, বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত। (The Third World refers to countries that are economically underdeveloped and seeking development outside the two major power blocs.)
২। পিটার ওয়র্সলি (Peter Worsley): পিটার ওয়র্সলির মতে, তৃতীয় বিশ্ব হলো এমন দেশগুলোর সমষ্টি, যেগুলো ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে এবং স্বাধীনতার পর উন্নয়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। (The Third World consists of societies that experienced colonialism and are pursuing economic and social development.)
৩। আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক (Andre Gunder Frank): আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্কের মতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অনুন্নয়ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈষম্য ও নির্ভরশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। (Underdevelopment in Third World countries is linked to unequal international economic relationships and dependency.)
৪। ইম্মানুয়েল ওয়ালারস্টেইন (Immanuel Wallerstein): ওয়ালারস্টেইনের বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্ব অনুযায়ী, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় দেশগুলোর সঙ্গে অসম সম্পর্কের মধ্যে থাকে। (Third World countries occupy peripheral positions in the global economic system and maintain unequal relations with core countries.)
৫। রাউল প্রেবিশ (Raúl Prebisch): রাউল প্রেবিশের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অসম কাঠামোর কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকে। (Developing countries remain disadvantaged due to unequal structures of international trade.)
৬। অক্সফোর্ড ডিকশনারি (Oxford Dictionary): অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, তৃতীয় বিশ্ব বলতে ঐতিহাসিকভাবে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝানো হয়। (The Third World refers historically to developing countries in Asia, Africa and Latin America.)
৭। স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন (Samuel P. Huntington): হান্টিংটনের মতে, উন্নয়নশীল সমাজগুলোতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক কাঠামো ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব দেখা যায়, যা তাদের উন্নয়নের গতিকে প্রভাবিত করে। (Developing societies often face imbalances between political institutions, economic structures and social change.)
উপরের সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলো এমন উন্নয়নশীল দেশসমূহ, যেগুলো ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক উন্নয়নের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এসব দেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক অগ্রগতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।
উপসংহার: তৃতীয় বিশ্বের দেশ ধারণাটি মূলত উন্নয়ন বৈষম্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বর্তমান সময়ে অনেক তৃতীয় বিশ্বের দেশ শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। তাই এই ধারণাকে শুধু অনুন্নয়নের নয়, বরং উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার দৃষ্টিতেও দেখা প্রয়োজন।