- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদ উভয়ই আধিপত্য বিস্তারের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি, উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালিতে পার্থক্য রয়েছে। উপনিবেশবাদে একটি শক্তিশালী দেশ সরাসরি অন্য দেশের ভূখণ্ড দখল করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অন্যদিকে নব্য উপনিবেশবাদে সরাসরি শাসন না করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়।
উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদের মধ্যে পার্থক্য:
১। নিয়ন্ত্রণের ধরন: উপনিবেশবাদে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য একটি দেশের ভূখণ্ড দখল করে সরাসরি শাসন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। অপরদিকে নব্য উপনিবেশবাদে কোনো দেশের ওপর সরাসরি শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয় না, বরং বিভিন্ন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপায়ের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা হয়।
২। রাজনৈতিক ক্ষমতা: উপনিবেশবাদে উপনিবেশকারী রাষ্ট্র সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনা করে। কিন্তু নব্য উপনিবেশবাদে একটি দেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিদ্যমান থাকে, তবে তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রভাব থাকতে পারে।
৩। ঐতিহাসিক সময়কাল: উপনিবেশবাদ মূলত ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিস্তারের সময় বিশেষ করে ১৫শ থেকে ২০শ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপকভাবে দেখা যায়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো স্বাধীনতা লাভের পর নব্য উপনিবেশবাদের ধারণা বেশি আলোচিত হয়।
৪। নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম: উপনিবেশবাদে সামরিক শক্তি, ভূখণ্ড দখল ও প্রত্যক্ষ প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হতো। নব্য উপনিবেশবাদে ঋণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
৫। অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য: উপনিবেশবাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উপনিবেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ, সম্পদ আহরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টি করা। নব্য উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নির্ভরতা সৃষ্টি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬। স্বাধীনতার অবস্থা: উপনিবেশবাদে অধীন দেশগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারিয়ে বিদেশি শক্তির শাসনের অধীনে থাকত। নব্য উপনিবেশবাদে দেশগুলো আইনগতভাবে স্বাধীন থাকে, কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে।
৭। সাংস্কৃতিক প্রভাব: উপনিবেশবাদে শাসক দেশ নিজেদের ভাষা, শিক্ষা ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও জীবনধারা উপনিবেশিত জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। নব্য উপনিবেশবাদে গণমাধ্যম, বিনোদন, ভোগবাদী সংস্কৃতি ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করা হয়।
৮। সামরিক ভূমিকা: উপনিবেশবাদে সামরিক শক্তি ছিল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রধান উপায়। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ভূখণ্ড দখল ও শাসন পরিচালনা করা হতো। নব্য উপনিবেশবাদে সাধারণত সরাসরি সামরিক দখলের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৯। সম্পর্কের প্রকৃতি: উপনিবেশবাদে শাসক ও শাসিতের সম্পর্ক ছিল সরাসরি এবং অসম। এক দেশ অন্য দেশের ওপর প্রকাশ্য কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করত। নব্য উপনিবেশবাদে সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে পরোক্ষ, যেখানে সহযোগিতা, বাণিজ্য বা উন্নয়ন সহায়তার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা হয়।
১০। উদাহরণ: উপনিবেশবাদের উদাহরণ হিসেবে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত, আফ্রিকার বিভিন্ন ইউরোপীয় উপনিবেশ উল্লেখ করা যায়। নব্য উপনিবেশবাদের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি বা শক্তিশালী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি আলোচিত হয়।
উপসংহার: উপনিবেশবাদ ও নব্য উপনিবেশবাদ উভয়ের মধ্যেই আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা বিদ্যমান। তবে উপনিবেশবাদে নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রত্যক্ষ ও রাজনৈতিক, আর নব্য উপনিবেশবাদে নিয়ন্ত্রণ সাধারণত পরোক্ষভাবে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।