- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা:
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের জন্ম হলেও একটি স্থায়ী শাসনতন্ত্র বা সংবিধান লাভ করতে দেশটির দীর্ঘ ৯ বছর সময় লেগেছিল। ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার কারণে শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াটি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে নানাবিধ জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা বিদ্যমান ছিল।
পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সমস্যাসমূহ
১। রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক: নবগঠিত পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণের বিষয়টি। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তৎকালীন পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু করে। এর ফলে পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, যা সংবিধান প্রণয়নের কাজকে দীর্ঘদিনের জন্য স্থবির ও জটিল করে তুলেছিল।
২। প্রতিনিধিত্বের সমস্যা: পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে জনসংখ্যার ভারসাম্যহীনতা সংবিধান তৈরির পথে বড় বাধা ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি থাকায় গণতান্ত্রিক নিয়মে তাদের আসন সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমা শাসকেরা বাঙালিদের এই সংখ্যাধিক্যকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না এবং তারা ক্ষমতার সমতা বজায় রাখার জন্য নানা অজুহাত তৈরি করতে থাকে।
৩। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন: পূর্ব পাকিস্তানসহ অন্যান্য প্রদেশগুলোর জন্য কতটুকু স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হবে, তা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের দাবি ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় রেখে বাকি সব ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারকে দেওয়া হোক। কিন্তু কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী একটি শক্তিশালী কেন্দ্র গঠনের পক্ষপাতী ছিল, যা প্রদেশের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে।
৪। ইসলামের ভূমিকা: পাকিস্তানকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইসলামের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। উলেমা সমাজ কট্টর ইসলামিক আইন প্রবর্তনের দাবি জানালেও আধুনিক পশ্চিমা শিক্ষিত নেতৃত্ব একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক কাঠামো চেয়েছিলেন। এই দুই মতাদর্শের দ্বন্দ্বের কারণে শাসনতন্ত্রে ধর্মের স্থান নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।
৫। ভৌগোলিক দূরত্ব: পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে প্রায় এক হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল এবং মাঝখানে অবস্থান করছিল ভারত। এই বিশাল দূরত্বের কারণে উভয় অঞ্চলের মানুষের চিন্তা, চেতনা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাহিদার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান ছিল। এমন একটি ভৌগোলিক বাস্তবতায় দুই অঞ্চলের জন্য একক গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্র তৈরি করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ বিষয়।
৬। অর্থনৈতিক বৈষম্য: দেশের সিংহভাগ রাজস্ব পূর্ব পাকিস্তান থেকে অর্জিত হলেও তা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে বেশি ব্যয় করা হতো। এই চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য সংবিধানে কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি বা রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে দুই অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে ঐকমত্য হচ্ছিল না। ফলে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণের বিষয়টি শাসনতন্ত্র প্রণয়নে বড় জটিলতা সৃষ্টি করে।
৭। এক ইউনিট ব্যবস্থা: পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশকে একত্রিত করে ‘এক ইউনিট’ বা এক প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। পশ্চিমা শাসকেরা বাঙালিদের রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করার কৌশল হিসেবে এই বিতর্কিত নীতিটি সংবিধানে যুক্ত করতে চেয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ এই অন্যায্য ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করায় শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরি বারবার থমকে যায়।
৮। আইনসভার গঠন: কেন্দ্রীয় আইনসভা এক কক্ষবিশিষ্ট হবে নাকি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে, তা নিয়ে দুই অংশের মধ্যে গভীর মতভেদ ছিল। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ হলে উচ্চকক্ষে প্রদেশগুলোর সমান প্রতিনিধিত্বের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা মার খেত। এই কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং আইনসভার সঠিক রূপরেখা নির্ধারণে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়।
৯। নির্বাচন পদ্ধতি: শাসনতন্ত্রে যৌথ নির্বাচন পদ্ধতি নাকি পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। মুসলিম লীগসহ ধর্মীয় দলগুলো মুসলিম ও অমুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও প্রগতিশীল দলগুলো যৌথ নির্বাচনের দাবি জানায়। এই সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তার সংঘাত শাসনতন্ত্রের চূড়ান্ত রূপায়ণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
১০। আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপ: পাকিস্তানের প্রথম দিকের রাজনীতিতে অসামরিক আমলা ও সামরিক কর্মকর্তাদের অতিমাত্রায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শাসনতন্ত্র প্রণয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। গোলাম মোহাম্মদ ও ইস্কান্দার মির্জার মতো আমলারা নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে নিয়মতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র চাননি। তারা বারবার রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে নিজেদের স্বার্থে সংবিধানের অগ্রগতিকে স্তিমিত করে রেখেছিলেন।
১১। রাজনৈতিক অস্থিরতা: স্বাধীনতার পর পরই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু এবং লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম নেতৃত্বহীনতা তৈরি করে। এরপর ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে সম্পূর্ণ অস্থির করে তোলে। এমন একটি অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতিতে কোনো সরকারের পক্ষেই সুদূরপ্রসারী সংবিধান প্রণয়ন করা সম্ভব ছিল না।
১২। গণপরিষদ বাতিল: ১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক প্রথম গণপরিষদ অবৈধভাবে ভেঙে দেওয়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা ছিল। দীর্ঘ সাত বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি করা শাসনতন্ত্রের খসড়াটি এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের ফলে পাকিস্তানের সাংবিধানিক যাত্রা দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে পড়ে এবং নতুন করে শুরু করতে হয়।
১৩। সংখ্যালঘুদের অধিকার: পাকিস্তানের সংবিধানে অমুসলিম বা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার এবং মর্যাদা কীরূপ হবে, তা নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। রাষ্ট্রকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণার দাবির মুখে অমুসলিমদের মনে নানামুখী শঙ্কা ও নাগরিক বৈষম্যের ভয় তৈরি হয়। একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সমঅধিকারভিত্তিক সংবিধানের অভাব সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছিল।
১৪। কেন্দ্রের ক্ষমতা: রাষ্ট্রের জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে গভর্নর জেনারেল বা রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা কতটুকু থাকবে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল। কেন্দ্রীয় শাসকগোষ্ঠী এই বিশেষ ক্ষমতা নিজেদের হাতে রেখে প্রাদেশিক সরকারকে যেকোনো সময় বরখাস্ত করার অধিকার চেয়েছিল। এই ধরনের অগণতান্ত্রিক ধারা সংবিধানে যুক্ত করার প্রচেষ্টাকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।
১৫। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা: শাসনতন্ত্রে বিচারবিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে কতটা স্বাধীন রাখা হবে, তা নিয়ে বিতর্কিত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী বিচারবিভাগকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছিল, যা একটি স্বাধীন সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী ছিল। একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছানো বেশ কঠিন ছিল।
১৬। আঞ্চলিক সংস্কৃতি: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং ঐতিহ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান বিদ্যমান ছিল। এই সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি বহুত্ববাদী শাসনতন্ত্র তৈরি করার সদিচ্ছা পশ্চিমা শাসকদের মধ্যে ছিল না। তারা বাঙালিদের ওপর নিজস্ব সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করায় সংবিধানে জাতীয় সংহতির বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
১৭। নেতৃত্বের সংকীর্ণতা: তৎকালীন মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ক্ষমতার লোভ সংবিধান প্রণয়নকে ব্যর্থ করে। তারা সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের অধিকারের কথা চিন্তা না করে কেবল নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার ফিকিরে ব্যস্ত ছিলেন। এই আন্তরিকতার অভাব এবং দূরদর্শিতার ঘাটতিই শাসনতন্ত্র তৈরির পথকে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘায়িত করেছিল।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র প্রণয়নের সমস্যাগুলো ছিল মূলত শাসকগোষ্ঠীর সংকীর্ণ মানসিকতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ফসল। দুই অঞ্চলের মধ্যকার বৈষম্য দূর না করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবিকে উপেক্ষা করে জোরপূর্বক শাসন চাপানোর চেষ্টার কারণেই দীর্ঘ ৯ বছর সময় লেগেছিল। ১৯৫৬ সালে বহু বিতর্কের পর প্রথম শাসনতন্ত্র গৃহীত হলেও তা পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় সংহতি ধরে রাখতে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল।