- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল এক সুদূরপ্রসারী ও দার্শনিক চিন্তাধারার ফসল। তার শিক্ষাব্যবস্থা কেবল জ্ঞান অর্জন নয়, বরং চরিত্র গঠন, নৈতিক উৎকর্ষ সাধন এবং একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। প্লেটোর শিক্ষা দর্শন আজও শিক্ষাবিদ ও দার্শনিকদের আলোচনার বিষয়। আধুনিক সমাজের প্রেক্ষাপটে তার এই শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু প্রাসঙ্গিক, তা বিচার করা জরুরি।
প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল দুটি বিষয়:
প্রথমত, প্রতিটি মানুষের জন্মগতভাবে কিছু নির্দিষ্ট গুণ থাকে, যা শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, সমাজকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে প্রতিটি শ্রেণির জন্য ভিন্ন ধরনের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এই তিনটি শ্রেণি হলো: শাসক, সৈনিক এবং উৎপাদক।
প্লেটোর মতে, শাসকশ্রেণি হবে দার্শনিক রাজা, যারা জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং ন্যায়পরায়ণতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাবে। তাদের জন্য থাকবে গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা এবং দর্শনের মতো বিষয়। সৈনিকদের জন্য থাকবে শারীরিক প্রশিক্ষণ, সঙ্গীত ও কবিতা, যা তাদের সাহস এবং নৈতিকতাকে শক্তিশালী করবে। আর উৎপাদক শ্রেণির জন্য থাকবে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষা।
প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু দিক বর্তমানকালেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যেমন:
১. চরিত্র গঠন: প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আজকের সমাজে যখন নৈতিক অবক্ষয় একটি বড় সমস্যা, তখন প্লেটোর এই দর্শন অত্যন্ত জরুরি।
২. মেধাবী নেতৃত্ব: প্লেটো মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কেবলমাত্র যোগ্য ও মেধাবীদের হাতে থাকা উচিত। তার দার্শনিক রাজা’র ধারণা বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন এবং যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরে।
৩. শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থায় শারীরিক ও মানসিক উভয় দিকের বিকাশের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। আজকের যুগে খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তা প্লেটোর এই ধারণারই প্রতিফলন।
তবে প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা বর্তমান সমাজে গ্রহণীয় নয়। যেমন:
১. শ্রেণি বিভাজন: প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থায় সমাজের মানুষকে জন্মগতভাবে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের সাম্য ও সমতার ধারণার পরিপন্থী।
২. নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি: যদিও প্লেটো নারীদের শিক্ষার অধিকারের পক্ষে ছিলেন, তবে তার সময়ে নারীদের জন্য পৃথক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল, যা আধুনিক সমাজে লিঙ্গ সমতার ধারণার সঙ্গে মেলে না।
৩. রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ: প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার তেমন কোনো স্থান ছিল না। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সৃজনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপসংহার: প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা একটি আদর্শ রাষ্ট্র ও সুনাগরিক তৈরির লক্ষ্যে প্রণীত হলেও, এর কিছু দিক আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক। প্লেটোর শিক্ষা ব্যবস্থা তার সময়ের প্রেক্ষাপটে এক বিপ্লবী চিন্তাধারা ছিল, যা আজও আমাদের অনেক কিছু শেখাতে পারে।
প্লেটোর শিক্ষা ভাবনা তার ‘রিপাবলিক’ (Republic) গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে। ৪২৭-৩৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি যে ‘অ্যাকাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ছিল ইউরোপের প্রথম উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্লেটোর গুরু ছিলেন সক্রেটিস এবং শিষ্য ছিলেন অ্যারিস্টটল। তাদের শিক্ষা ও দর্শন পশ্চিমা সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৯৫০ সালের পর থেকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্লেটোর দার্শনিক রাজা’র ধারণা আজও রাজনৈতিক বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়।

