- readaim.com
- 0
সূচনা: দর্শনশাস্ত্রের সুবিশাল আকাশে বস্তুবাদ ও ভাববাদ দুটি চিরন্তন এবং বিপরীতমুখী নক্ষত্র। জগৎ ও জীবনের মূল সত্তা আসলে কী—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই এই দুটি মতবাদের জন্ম হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এদের সংঘাতকে জটিল মনে হলেও, সহজ ভাষায় এটি হলো বস্তু বনাম চেতনার এক রোমাঞ্চকর লড়াই।
১। মূল ভিত্তি: বস্তুবাদ বিশ্বাস করে যে এই দৃশ্যমান জড় জগৎ বা পদার্থই মহাবিশ্বের একমাত্র আদি এবং আসল সত্য। অপরদিকে, ভাববাদ মনে করে যে বাহ্যিক জগতের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই, বরং মানুষের মন, চেতনা বা আত্মাই হলো সবকিছুর মূল ভিত্তি। অর্থাৎ, একটির শুরু মাটি ও কণা থেকে, অন্যটির শুরু ভাব বা চিন্তা থেকে।
২। চেতনার স্থান: বস্তুবাদের দৃষ্টিতে চেতনা বা মন হলো উন্নত মস্তিস্কের একটি জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া বা বস্তুরই একটি রূপান্তরিত রূপ মাত্র। কিন্তু ভাববাদের অনুসারীরা চেতনাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অবিনশ্বর মনে করেন। তাদের মতে, মন বা আত্মা কোনো জড় বস্তুর ওপর নির্ভর করে না, বরং বস্তুই মনের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে।
৩। জগতের সৃষ্টি: জগৎ কীভাবে সৃষ্টি হলো তা নিয়ে বস্তুবাদের ব্যাখ্যা অত্যন্ত সহজ—এটি প্রকৃতির নিয়ম মেনে বস্তু কণার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজে নিজেই বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে, ভাববাদীরা বিশ্বাস করেন যে এক পরম মন, ঈশ্বর বা কোনো অলৌকিক মহাশক্তি এই মহাবিশ্বকে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এবং সুপরিকল্পিত উপায়ে সৃষ্টি করেছেন।
৪। জ্ঞানের উৎস: আমরা কীভাবে জ্ঞান লাভ করি, তা নিয়ে বস্তুবাদ বলে যে আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাই হলো সমস্ত জ্ঞানের একমাত্র উৎস। কিন্তু ভাববাদ এই ধারণাকে পুরোপুরি মেনে নেয় না। তাদের মতে, প্রকৃত জ্ঞান ইন্দ্রিয় দিয়ে পাওয়া যায় না, তা আসে মানুষের ভেতরের প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, ধ্যান এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে।
৫। সত্যের পরিমাপ: বস্তুবাদের কাছে সত্য হলো সেটাই যা ল্যাবরেটরিতে প্রমাণ করা যায়, ছোঁয়া যায় বা চোখে দেখা যায়। তারা দৃশ্যমান প্রমাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বিপরীতপক্ষে, ভাববাদের কাছে সত্য হলো একটি মানসিক বা আদর্শিক ধারণা। যা চোখে দেখা যায় না, যেমন—মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার ও সৌন্দর্য, তা-ই ভাববাদের কাছে পরম সত্য।
৬। ঈশ্বরের অস্তিত্ব: বস্তুগত দর্শনে ঈশ্বর বা কোনো অলৌকিক শক্তির অস্তিত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়, কারণ এর কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। ভাববাদী দর্শনে আবার ঈশ্বর বা পরমাত্মাই হলেন পুরো মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। ঈশ্বরকে ছাড়া ভাববাদীরা এই জগতের কোনো নিয়মতান্ত্রিক অস্তিত্ব বা নৈতিক শৃঙ্খলার কথা কল্পনাই করতে পারেন না।
৭। বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি: বস্তুবাদ সব সময় আধুনিক বিজ্ঞান, যুক্তি, পদার্থবিদ্যা ও জীববিজ্ঞানের ওপর গভীরভাবে নির্ভর করে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করে। তবে ভাববাদ বিজ্ঞানকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও একে সীমিত মনে করে। ভাববাদীদের মতে, বিজ্ঞান কেবল জগতের বাইরের খোলসটা দেখাতে পারে, কিন্তু ভেতরের আসল রহস্য কেবল দর্শনই উন্মোচন করতে পারে।
৮। মানুষের ভাগ্য: মানুষের ভাগ্য বা ভবিষ্যৎ নিয়ে বস্তুবাদ বলে যে মানুষ নিজের কর্ম এবং পারিপার্শ্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য গড়ে তোলে। অন্যদিকে, ভাববাদ বিশ্বাস করে যে মানুষের জীবন ও ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত কোনো মহাজাগতিক পরিকল্পনা বা কর্মফলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা কোনো অদৃশ্য শক্তি পরিচালনা করে।
৯। পরিবর্তনের নিয়ম: বস্তুবাদ মনে করে যে প্রকৃতির সবকিছুই দ্বন্দ্ব এবং বস্তুগত পরিবর্তনের নিয়ম বা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত বিবর্তিত হয়ে চলেছে। ভাববাদ অবশ্য এই পরিবর্তনকে বাহ্যিক রূপান্তর বলে মনে করে। তাদের মতে, ভেতরের মূল আধ্যাত্মিক সত্যটি সব সময় অপরিবর্তনীয়, চিরন্তন, সুন্দর এবং একদম স্থির থাকে।
১০। মূল্যবোধের ভিত্তি: নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ব্যাপারে বস্তুবাদীদের ধারণা হলো, এগুলো সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষেরই তৈরি কিছু সামাজিক নিয়ম মাত্র। কিন্তু ভাববাদীরা নৈতিকতাকে ঈশ্বরের আদেশ বা প্রকৃতির এক পরম নিয়ম হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, মূল্যবোধ কোনো আপেক্ষিক বিষয় নয়, এটি চিরন্তন এবং সব যুগে সবার জন্য সমান।
১১। জীবনের উদ্দেশ্য: বস্তুবাদের মতে মানুষের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা, প্রকৃতির রহস্য জানা এবং মানব সমাজের উন্নয়ন ঘটানো। ভাববাদ কিন্তু জীবনের উদ্দেশ্যকে আরও অনেক উঁচুতে স্থান দেয়। তাদের মতে, মানব জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আত্মোপলব্ধি করা, আত্মার মুক্তি লাভ করা এবং পরম সত্তার সাথে মিলিত হওয়া।
১২। ইতিহাসের ব্যাখ্যা: মানব ইতিহাসের অগ্রগতিকে বস্তুবাদ দেখে অর্থনৈতিক শক্তি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রেণী সংগ্রামের একটি বাস্তব ফলাফল হিসেবে। ভাববাদীরা আবার ইতিহাসকে দেখেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। তাদের মতে, ইতিহাস হলো বড় বড় আদর্শ, মহান চিন্তা এবং কিছু যুগান্তকারী মানুষের মানসিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ও তার ক্রমান্বয় বিকাশ।
১৩। মৃত্যুর ধারণা: মৃত্যুর পর কী হয়—এই প্রশ্নে বস্তুবাদ অত্যন্ত কঠোর ও বাস্তববাদী, তাদের মতে মৃত্যুর সাথে সাথেই মানুষের অস্তিত্ব চিরতরে শেষ হয়ে যায়। ভাববাদ এখানে পরম সান্ত্বনা দেয় এবং বিশ্বাস করে যে শরীরের মৃত্যু হলেও আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। আত্মা অমর এবং মৃত্যুর পর তা অন্য কোনো জগতে প্রবেশ করে।
১৪। সমাজ গঠন: বস্তুাবাদী দর্শন সমাজ গঠনে মানুষের অর্থনৈতিক সাম্য, বাসস্থান, খাদ্য এবং বস্তুগত সুযোগ-সুবিধার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকে। ভাববাদী দর্শন অবশ্য সমাজ গঠনে মানুষের চরিত্র গঠন, ধর্মীয় অনুশাসন, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং মানসিক ও আত্মিক উন্নতির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করে।
১৫। শিল্প ও সাহিত্য: শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে বস্তুবাদ বাস্তব জীবন, মানুষের দুঃখ-কষ্ট এবং চারপাশের রূঢ় বাস্তবতাকে হুবহু ফুটিয়ে তোলার পক্ষে মত দেয়। ভাববাদ কিন্তু শিল্পে কল্পনার ডানা মেলতে ভালোবাসে। তারা বাস্তবতার চেয়ে ভেতরের আবেগ, রূপক, প্রতীক এবং এক অলৌকিক বা অতিন্দ্রীয় সৌন্দর্যকে সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে পছন্দ করে।
প্রধান দার্শনিকগণ: বস্তুবাদের প্রধান ঝাণ্ডাধারী দার্শনিকদের মধ্যে রয়েছেন ডেমোক্রিটাস, কার্ল মার্কস, ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এবং লেনিনের মতো বাস্তববাদী চিন্তাবিদগণ। অন্যদিকে, ভাববাদের মহাসড়ক তৈরি করেছেন প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ইমানুয়েল কান্ট এবং হেগেলের মতো বিশ্বখ্যাত সব প্রজ্ঞাবান ও আদর্শবাদী দার্শনিকেরা।
১৭। চরম রূপ: বস্তুবাদের চরম রূপ হলো যান্ত্রিক বস্তুবাদ, যা মানুষকে কেবল একটি রক্ত-মাংসের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। ভাববাদের চরম রূপ হলো অহংবাদ বা চরম আত্মগত ভাববাদ, যা মনে করে এই পুরো পৃথিবীটাই আসলে মানুষের নিজের মনের একটি অলীক কল্পনা মাত্র।
ভাববাদী তত্ত্বের (Idealism) প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
- বাস্তবতার অস্বীকৃতি: এই তত্ত্ব বাহ্যিক ও বস্তুগত জগতের স্বাধীন অস্তিত্বকে অস্বীকার করে কেবল মন বা চেতনাকে সত্য বলে, যা বাস্তবসম্মত নয়।
- অতি-কাল্পনিক ও অমূর্ত: ভাববাদ অতিরিক্ত মাত্রায় আধ্যাত্মিক এবং কাল্পনিক হওয়ায় এটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করা কঠিন।
- বস্তুবাদের অবমূল্যায়ন: মানুষের জীবন ধারণের জন্য বস্তুগত পরিবেশ ও অর্থনৈতিক উপাদান অপরিহার্য। ভাববাদ এই বাস্তব প্রয়োজনগুলোকে উপেক্ষা করে।
- প্রয়োগযোগ্যতার অভাব: বাস্তব জীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে এই তত্ত্ব কোনো কার্যকর বা বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা দিতে পারে না।
শেষকথা: পরিশেষে বলা যায়, বস্তুবাদ ও ভাববাদ হলো একটি মুদ্রার দুটি পিঠের মতো, যা মানব সভ্যতার চিন্তাজগতকে সমৃদ্ধ করেছে। বস্তুবাদ আমাদের শিখিয়েছে মাটিতে পা রেখে বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে এবং বিজ্ঞানকে ভালোবাসতে। পক্ষান্তরে, ভাববাদ আমাদের শিখিয়েছে মনের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে, নৈতিক হতে এবং স্বপ্নের পরিধিকে আকাশ ছোঁয়া করতে। তাই জীবনকে পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝতে গেলে এই দুই মতবাদেরই প্রয়োজন রয়েছে।