- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: মার্কসবাদী তত্ত্ব ও দর্শনে কমরেড মাও সে তুং এক অনন্য অধ্যায়ের নাম। তিনি কেবল কার্ল মার্ক্স বা লেনিনের তত্ত্বকে অন্ধভাবে অনুকরণ করেননি, বরং তৎকালীন অনুন্নত ও কৃষিপ্রধান চীনের বাস্তবতায় তাকে সফলভাবে প্রয়োগ করেছিলেন। বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে মাও সে তুং-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিন্তাধারা আজ ‘মাওবাদ’ নামে সমাদৃত।
১। মাওবাদ প্রতিষ্ঠা: কার্ল মার্ক্স এবং ভ্লাদিমির লেনিনের বৈপ্লবিক তত্ত্বকে মাও সে তুং চীনের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন রূপ দেন। তিনি দেখিয়েছেন যে বিপ্লবের কোনো নির্দিষ্ট বা বাঁধাধরা আন্তর্জাতিক ছক হয় না। প্রতিটি দেশের নিজস্ব বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপরেখা তৈরি করতে হয়। তাঁর এই তাত্ত্বিক রূপান্তরই বিশ্বজুড়ে ‘মাওবাদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
২। কৃষক সমাজকে প্রাধান্য: সনাতন মার্কসবাদে বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে শহুরে শ্রমিক শ্রেণী বা সর্বহারাদের বিবেচনা করা হতো। কিন্তু মাও সে তুং চীনের বাস্তবতায় বুঝতে পেরেছিলেন যে বিশাল কৃষক সমাজকে বাদ দিয়ে বিপ্লব অসম্ভব। তিনি ভূস্বামী ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে তাদের বিপ্লবের প্রধান শক্তিতে পরিণত করেন। এটি মার্কসবাদে একটি অত্যন্ত যুগান্তকারী এবং বাস্তবসম্মত সংযোজন ছিল।
৩। দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ: মাও সে তুং সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য এক নতুন সামরিক কৌশল আবিষ্কার করেন, যা ‘দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এই কৌশলের মূল কথা হলো শত্রু শক্তিশালী হলে সরাসরি মুখোমুখি না হয়ে গ্রামাঞ্চলকে ভিত্তিমূল হিসেবে গড়ে তোলা। ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চল থেকে শহরকে অবরুদ্ধ করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করা হতো। এই যুদ্ধকৌশল বিশ্বের বহু দেশের মুক্তি সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
৪। গেরিলা যুদ্ধকৌশল: মাও সে তুং গেরিলা যুদ্ধের চার নীতি তৈরি করেছিলেন যা সামরিক বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিখ্যাত। তিনি বলতেন, শত্রু যখন এগোবে তখন আমরা পিছিয়ে যাব, শত্রু যখন থামবে তখন আমরা তাকে হয়রানি করব। শত্রু যখন ক্লান্ত হবে তখন আমরা আঘাত করব এবং শত্রু যখন পালাবে তখন আমরা তাকে তাড়া করব। এই সহজ ও কার্যকরী কৌশলটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে সাহায্য করেছিল।
৫। নয়া গণতন্ত্রের ধারণা: মাও সে তুং একটি নতুন ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা বলেন যা ‘নয়া গণতন্ত্র’ নামে পরিচিত। সমাজতন্ত্রে সরাসরি প্রবেশের আগে আধা-সামন্ততান্ত্রিক ও আধা-ঔপনিবেশিক দেশে এই ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। এখানে বুর্জোয়া শ্রেণীর পরিবর্তে চার প্রধান শ্রেণী—শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী এবং জাতীয় পুঁজিবাদের যৌথ একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথকে অনেক সহজ ও মসৃণ করে তুলেছিল।
৬। বৈপরীত্যের তত্ত্ব: দর্শনের ক্ষেত্রে মাও সে তুং-এর ‘অন কনট্রাডিকশন’ বা বৈপরীত্যের তত্ত্ব একটি অসাধারণ অবদান। তিনি প্রমাণ করেন যে প্রকৃতির প্রতিটি বিষয়ে এবং সমাজ বিকাশের প্রতিটি স্তরে বৈপরীত্য বিদ্যমান থাকে। এই বৈপরীত্যকে তিনি প্রধান ও অপ্রধান—এই দুই ভাগে ভাগ করে সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, বৈপরীত্যের দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতের মধ্য দিয়েই সমাজ প্রগতির পথে এগিয়ে যায়।
৭। অনুশীলনের দর্শন: মাও সে তুং তাঁর ‘অন প্র্যাকটিস’ প্রবন্ধে জ্ঞান ও কর্মের মধ্যকার গভীর সম্পর্কের কথা আলোচনা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে কেবল বই পড়ে বা তত্ত্ব মুখস্থ করে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করা যায় না। বাস্তব কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের জ্ঞান জন্মায় এবং সেই জ্ঞানকে আবার সমাজ পরিবর্তনের কাজে প্রয়োগ করতে হয়। তত্ত্ব ও বাস্তব প্রয়োগের এই মেলবন্ধন মার্কসীয় জ্ঞানতত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেছে।
৮। সাংস্কৃতিক বিপ্লব: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও বুর্জোয়া মানসিকতা ও পুঁজিবাদী পুনরুত্থানের বিপদ থেকে যায় বলে মাও মনে করতেন। এই বিপদ রুখতে এবং মানুষের চিন্তাধারার আমূল পরিবর্তনের জন্য তিনি ‘মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরু করেছিলেন। আমলাতন্ত্র ও পুরনো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এটি সমাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার এক আপসহীন সংগ্রাম ছিল।
৯। গণলাইনের ধারণা: মাও সে তুং-এর একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক স্লোগান ছিল ‘জনগণের মধ্য থেকে জনগণের কাছে’। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বিপ্লবীদের সবসময় সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতে হবে। জনগণের সমস্যাগুলো বুঝতে হবে, সেগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে এবং সমাধানের পথ নিয়ে আবার জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হবে। এই গণলাইন বা মাস-লাইন নীতি কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমিয়ে দেয়।
১০। তিন বিশ্ব তত্ত্ব: আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে মাও সে তুং ‘তিন বিশ্ব তত্ত্ব’ বা থ্রি ওয়ার্ল্ডস থিওরি প্রদান করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী তিনি তৎকালীন বিশ্বকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছিলেন। মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল প্রথম বিশ্ব, উন্নত দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্ব এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলো ছিল তৃতীয় বিশ্ব। তিনি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
১১। আমলাতন্ত্রের বিরোধিতা: সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে পার্টি ও সরকারের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরি হতে পারে। মাও সে তুং এই প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের চরম বিরোধী ছিলেন এবং একে সমাজতন্ত্রের শত্রু মনে করতেন। তিনি কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের সাথে মিশে কাজ করার নির্দেশ দিতেন। ক্যাডার ও নেতাদের নিয়মিত শারীরিক শ্রমে অংশ নেওয়ার নিয়ম করে তিনি এই বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করেন।
১২। নারী মুক্তি আন্দোলন: চীনের সামন্ততান্ত্রিক সমাজে নারীদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ও দাসত্বের সমতুল্য ছিল। মাও সে তুং ঘোষণা করেন যে ‘নারীরা অর্ধেক আকাশ ধরে রেখেছে’ এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমাজতন্ত্র অসম্ভব। তিনি বাল্যবিয়ে ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করেন এবং নারীদের সম্পত্তিতে সমান অধিকার প্রদান করেন। উৎপাদনমুখী কাজে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি সমাজ গঠনে নারী শক্তির জাগরণ ঘটান।
১৩। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনা: মাও সে তুং সাম্রাজ্যবাদকে একটি ‘কাগজের বাঘ’ বা পেপার টাইগার হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাইরে থেকে দেখতে একে যতই শক্তিশালী মনে হোক না কেন, জনগণের সম্মিলিত শক্তির সামনে এটি অত্যন্ত দুর্বল। তাঁর এই সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বের পরাধীন ও শোষিত জাতিগুলোকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তিনি সর্বদা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জানাতেন।
১৪। জনগণের সেনা: মাও সে তুং এমন একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যা কেবল যুদ্ধ করবে না, বরং জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে। রেড আর্মির বা লাল ফৌজের সৈন্যদের জন্য তিনি কঠোর নিয়ম ও নৈতিক আচরণবিধি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কৃষকদের ফসলের ক্ষতি না করা এবং সাধারণ মানুষের সাথে বিনয়ী আচরণ করা ছিল বাধ্যতামূলক। এই জনবান্ধব নীতির কারণে সেনাবাহিনী জনগণের বিপুল সমর্থন ও ভালোবাসা লাভ করেছিল।
১৫। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি: চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে মাও সে তুং নিজস্ব ধারার সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক মডেল প্রবর্তন করেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভারী শিল্পনির্ভর মডেলের অন্ধ অনুকরণ না করে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি নেন। তিনি গ্রামীণ এলাকায় ‘পিপলস কমিউন’ বা যৌথ খামার ব্যবস্থা চালু করেন। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত হয়।
১৬। ধারাবাহিক বিপ্লব: মাও সে তুং মনে করতেন যে সমাজতান্ত্রিক সমাজ কোনো স্থির বা চূড়ান্ত অবস্থা নয়। সমাজতন্ত্রে পৌঁছানোর পরও সমাজ থেকে শ্রেণী সংগ্রাম এবং বুর্জোয়া ভাবাদর্শ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় না। তাই সমাজকে প্রতিনিয়ত বিশুদ্ধ রাখতে এবং পুঁজিবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে ধারাবাহিক বিপ্লবের প্রয়োজন রয়েছে। এই তত্ত্বটি মার্কসবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এক নতুন ও বিতর্কিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছে।
১৭। আত্মনির্ভরশীলতার নীতি: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভর না করে নিজের শক্তিতে দাঁড়িয়ে থাকার নীতি শিক্ষা দিয়েছিলেন মাও সে তুং। তিনি বিশ্বাস করতেন যে একটি বিপ্লবী দেশকে অর্থনৈতিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রেই স্বাবলম্বী হতে হবে। চীনের বিপুল জনসংখ্যাকে তিনি বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার বৈপ্লবিক কৌশল দেখান। এই আত্মনির্ভরশীলতার নীতিই আধুনিক চীনের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির সূচনা করেছিল।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায় যে, মাও সে তুং কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না, বরং মার্কসবাদের তাত্ত্বিক ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার এক মহান কারিগর ছিলেন। তিনি মার্কসবাদকে ইউরোপীয় গণ্ডি থেকে বের করে এশিয়ার অনুন্নত ও গ্রামীণ সমাজের বাস্তবতায় সফলভাবে রূপান্তর করেছিলেন। তাঁর এই যুগান্তকারী চিন্তাধারা ও বৈপ্লবিক দর্শন আজীবন বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত এবং নিপীড়িত মানুষের মুক্তির লড়াইয়ে প্রেরণার আলো হয়ে থাকবে।