- readaim.com
- 0
উত্তর।।ভূমিকা: প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো তাঁর ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে একটি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের শ্রেণি বিভাজন ছিল একটি মৌলিক ভিত্তি। তাঁর মতে, একটি ন্যায়পরায়ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিকদের তাদের জন্মগত মেধা ও গুণাবলি অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করা অপরিহার্য। এই শ্রেণি বিভাজন ছিল রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণ ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি কৌশল। প্লেটোর এই মতবাদটি কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল মানুষের চারিত্রিক গুণাবলি এবং সামাজিক ভূমিকার এক দার্শনিক ব্যাখ্যা।
প্লেটোর মতে, মানুষের আত্মার তিনটি অংশ রয়েছে: যুক্তি (Reason), সাহস (Spirit) এবং ক্ষুধা বা কামনা (Appetite)। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই তিনটি গুণের মধ্যে যে গুণটি কোনো ব্যক্তির মধ্যে প্রাধান্য পায়, সেই অনুযায়ী তার সামাজিক অবস্থান ও দায়িত্ব নির্ধারিত হয়। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তিনি সমাজকে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলেন:
১. শাসক শ্রেণি (Philosopher-Kings): এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে যুক্তি বা প্রজ্ঞা প্রধান থাকে। তারা জ্ঞানের সাধক এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রতীক। প্লেটো মনে করতেন, শুধুমাত্র এই শ্রেণির মানুষরাই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যোগ্য, কারণ তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারেন। তাদের জন্য গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদির মতো উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল। এই শ্রেণি থেকে কেউ যাতে দুর্নীতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার ত্যাগ করতে হতো।
২. সৈনিক শ্রেণি (Auxiliaries or Warriors): এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে সাহস বা পরাক্রম প্রধান থাকে। তাদের প্রধান কাজ হলো রাষ্ট্রকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি বজায় রাখা। তাদের জন্য ছিল কঠোর শারীরিক প্রশিক্ষণ, সংগীত ও কবিতা, যা তাদের সাহস ও নৈতিকতাকে শক্তিশালী করবে। তারাও শাসক শ্রেণির মতো ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার থেকে দূরে থাকবে, যাতে তাদের একমাত্র লক্ষ্য হয় রাষ্ট্রের সেবা করা।
৩. উৎপাদক শ্রেণি (Producers): এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষুধা বা কামনা প্রধান থাকে। এই শ্রেণিতে কৃষক, কারিগর, ব্যবসায়ী ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের কাজ ছিল রাষ্ট্রের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদন করা। এই শ্রেণির মানুষদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখার অধিকার ছিল। প্লেটোর মতে, তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকবে না।
প্লেটো এই শ্রেণি বিভাজনকে একটি জৈবিক ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখেছিলেন। তিনি মনে করতেন, এই তিনটি শ্রেণি একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কাজ করলেই একটি আদর্শ ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল ‘বিশেষজ্ঞের শাসন’ (Rule of the Experts), যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার জন্মগত গুণ ও মেধা অনুযায়ী রাষ্ট্রের জন্য তার ভূমিকা পালন করবে।
উপসংহার: প্লেটোর শ্রেণি বিভাজনের ধারণাটি একটি নিখুঁত ও ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, যেখানে প্রত্যেকের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট ছিল। যদিও এই মতবাদটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের সাম্য ও সমতার ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তবে এটি রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খলতা ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। প্লেটোর এই তত্ত্ব আজও রাজনৈতিক দর্শন ও সমাজতত্ত্বের গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রের নাগরিকদের তাদের জন্মগত মেধা ও গুণাবলির ভিত্তিতে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা উচিত: শাসক, সৈনিক এবং উৎপাদক।
প্লেটো তাঁর অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন ৩৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, যা ছিল পশ্চিমা বিশ্বের প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাঁর ছাত্র অ্যারিস্টটল এই শ্রেণি বিভাজনের সমালোচনা করে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন উপস্থাপন করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কিছু স্বৈরাচারী শাসক প্লেটোর দার্শনিক রাজার ধারণাকে তাদের শাসনের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

