- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: সমাজবিজ্ঞান এবং নৃতত্ত্বের জগতে, বিবর্তনবাদ (Evolutionism) ও ক্রিয়াবাদ (Functionalism) হলো দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ। এই মতবাদগুলি আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে গঠিত, পরিবর্তিত ও টিকে থাকে, তা বুঝতে সাহায্য করে। বিবর্তনবাদ ব্যাখ্যা করে সমাজের অগ্রগতির ধারা, আর ক্রিয়াবাদ দেখায় সমাজের বিভিন্ন অংশের পারস্পরিক নির্ভরতা ও ভূমিকা। এই দুটি ধারণা সমাজ বিশ্লেষণের ভিত্তিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
📖 শাব্দিক অর্থ
- বিবর্তনবাদ (Evolutionism): ইংরেজি ‘Evolution’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো পরিবর্তন বা ক্রমবিকাশ। এই শব্দটি মূলত জীববিদ্যা থেকে এসেছে, যেখানে এটি সরল থেকে জটিল জীবনের দিকে ক্রমান্বয়ে উন্নতির ধারণাকে বোঝায়।
ক্রিয়াবাদ (Functionalism): ইংরেজি ‘Function’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো কার্য বা ভূমিকা। এই মতবাদ সমাজকে একটি জীবন্ত দেহের মতো মনে করে, যেখানে প্রতিটি অংশই কোনো না কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা ভূমিকা পালন করে।
বিবর্তনবাদ ও ক্রিয়াবাদ উভয়ের পরিচয়
বিবর্তনবাদ হলো এমন একটি তত্ত্ব যা মনে করে সমাজ একটি রৈখিক (linear) পথে অগ্রসর হয়। অর্থাৎ, মানব সমাজ একটি সরল, আদিম অবস্থা থেকে ক্রমান্বয়ে আধুনিক ও জটিল অবস্থার দিকে ধাবিত হয়। এই তত্ত্বে বিশ্বাস করা হয় যে সব সমাজই একই স্তর বা ধাপ পার করে উন্নত হয়। এর প্রধান প্রবক্তারা মনে করেন, সভ্যতার অগ্রগতিতে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করে।
অন্যদিকে, ক্রিয়াবাদ হলো একটি দৃষ্টিকোণ যা সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, রীতিনীতি বা উপাদানকে সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো নির্দিষ্ট কাজ (function) বা অবদান রাখে বলে মনে করে। এই তত্ত্বে সমাজের কোনো একটি অংশকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে, তার সঙ্গে অন্যান্য অংশের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সমাজের প্রতি তার ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সহজ ও সরল ভাষায় বিবর্তনবাদ ও ক্রিয়াবাদ-এর তিনটি করে প্রামাণ্য সংজ্ঞা নিচে দেওয়া হলো:
🧬 বিবর্তনবাদ (Evolutionism)
বিবর্তনবাদ হলো জীব এবং সমাজ-সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ বা পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি তত্ত্ব। নৃবিজ্ঞানে এটি ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি প্রধান ধারা ছিল।
১. সহজ সংজ্ঞা: বিবর্তনবাদ এমন একটি ধারণা যা বলে যে, সমাজ ও সংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট, একরৈখিক পথ ধরে সরল অবস্থা থেকে জটিল ও উন্নত অবস্থায় সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়।
২. প্রামাণ্য সংজ্ঞা (জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে): কোনো জীবের জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকারযোগ্য বৈশিষ্ট্যে (যেমন: জিনগত বৈশিষ্ট্য) বংশপরম্পরায় পরিবর্তন, সঞ্চারণ ও অভিযোজনের প্রক্রিয়াকে বিবর্তন বলে।
৩. নৃবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে: এটি হলো সেই তত্ত্ব যা মনে করে পৃথিবীর সকল মানব সমাজ একই ধরনের ক্রমিক স্তর (যেমন: বন্যদশা → বর্বরদশা → সভ্যদশা) পার হয়ে আধুনিক অবস্থায় এসেছে।
🛠️ ক্রিয়াবাদ (Functionalism)
ক্রিয়াবাদ হলো নৃবিজ্ঞানের একটি তত্ত্ব যা সমাজ-সংস্কৃতির প্রতিটি অংশকে একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখে, যা সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এটি বিবর্তনবাদের একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে আসে।
১. সহজ সংজ্ঞা: ক্রিয়াবাদ হলো সেই তত্ত্ব যা বলে যে, সমাজের প্রতিটি প্রথা, প্রতিষ্ঠান বা বিশ্বাস সেই সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বা সদস্যদের প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য নির্দিষ্ট ভূমিকা (function) পালন করে।
২. ম্যালিনোস্কির দৃষ্টিকোণ (ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ): এটি সেই দৃষ্টিভঙ্গি যা মনে করে যে, সংস্কৃতির প্রতিটি উপাদান (যেমন: ধর্ম বা আচার) মানুষের জৈবিক বা মানসিক চাহিদা (যেমন: খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপত্তা) মেটানোর জন্য কাজ করে।
৩. কাঠামো-ক্রিয়াবাদের দৃষ্টিকোণ (সামাজিক কাঠামো বজায় রাখা): ক্রিয়াবাদ সমাজকে একটি জীবন্ত দেহের মতো দেখে, যেখানে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর (যেমন: সামাজিক প্রতিষ্ঠান, প্রথা) কাজ হলো সম্পূর্ণ সমাজের কাঠামোটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এর ভারসাম্য বজায় রাখা।
উপসংহার: বিবর্তনবাদ এবং ক্রিয়াবাদ সমাজ বিশ্লেষণের দুটি শক্তিশালী ধারা। বিবর্তনবাদ সমাজকে গতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে, তার দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি ও পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করে। পক্ষান্তরে, ক্রিয়াবাদ সমাজের স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেয় এবং এর বিভিন্ন উপাদানের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে। যদিও উভয় মতবাদেরই সমালোচনা রয়েছে (যেমন: বিবর্তনবাদ পশ্চিমা সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করে, আর ক্রিয়াবাদ পরিবর্তনকে উপেক্ষা করে), তবুও সমাজবিজ্ঞান ও নৃতত্ত্বের তাত্ত্বিক বিকাশে এই দুটি দৃষ্টিকোণের অবদান অনস্বীকার্য। এদের মাধ্যমেই সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল প্রক্রিয়াগুলিকে স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হয়েছে।

