- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো মানুষের বেঁচে থাকার রসদ। সুদূর অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান দু’টি পথ হলো খাদ্য সংগ্রহ এবং খাদ্য উৎপাদন। এই দুটি ব্যবস্থার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব রয়েছে যা মানব সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করেছে। খাদ্য সংগ্রহের অর্থনীতি নির্ভর করে প্রকৃতির উপর, যেখানে খাদ্য উৎপাদনের অর্থনীতি মানুষকে দিয়েছে প্রকৃতির ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ও স্থায়িত্ব। এই নিবন্ধে আমরা এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি সহজ ও আকর্ষণীয় ভাষায় আলোচনা করব।
১।ভ্রাম্যমাণ জীবন: খাদ্য সংগ্রহ বা শিকারভিত্তিক অর্থনীতিতে মানুষ একস্থানে স্থায়ীভাবে বাস করত না। খাদ্যের সন্ধানে এবং শিকারের পিছু নিতে তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হতো, যা তাদের জীবনকে করে তুলেছিল যাযাবর। বন্য পশুপাখির গতিপথ এবং ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বনাঞ্চল ও জলস্রোতের প্রাচুর্যপূর্ণ স্থানে তাদের শিবির স্থাপন করতে হতো। এই জীবনযাত্রার কারণে তাদের স্থায়ী কোনো বাসস্থান, বৃহৎ সামাজিক কাঠামো বা সম্পত্তির ধারণা গড়ে ওঠেনি। এই প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তনই ছিল তাদের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং বেঁচে থাকার কৌশল।
২।প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা: খাদ্য সংগ্রহের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির দয়া ও প্রাচুর্যের উপর নির্ভরশীল। শিকার, ফলমূল, কন্দমূল ও মধু সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের খাদ্য চাহিদা পূরণ হতো। প্রকৃতির রুদ্র রূপ যেমন খরা, বন্যা বা প্রতিকূল আবহাওয়া তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলত। ফলস্বরূপ, তাদের খাদ্যের জোগান ছিল অনিয়মিত ও অনিশ্চিত, যার কারণে প্রায়শই তাদের অনাহার ও দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে হতো। তাই, এই সমাজের মানুষেরা প্রকৃতির প্রতি এক প্রকার শ্রদ্ধা ও ভয়মিশ্রিত মনোভাব পোষণ করত।
৩।সীমিত প্রযুক্তি: খাদ্য সংগ্রহকারী ও প্রথম দিকের উৎপাদনকারী সমাজগুলিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সীমিত ও সরল। তারা মূলত পাথর, কাঠ ও হাড়ের তৈরি সাধারণ হাতিয়ার ব্যবহার করত—যেমন বর্শা, তীর-ধনুক, হাতকুড়াল ইত্যাদি। পরবর্তীকালে খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজ লাঙল, কোদাল ও সেচের মতো উন্নত সরঞ্জাম আবিষ্কার করে। তবে সামগ্রিকভাবে, এই অর্থনীতিতে জটিল কোনো যন্ত্রপাতির ব্যবহার ছিল না। এই সহজ প্রযুক্তি তাদের প্রয়োজন মিটাত এবং প্রকৃতি থেকে খাদ্য সংগ্রহ ও প্রথমদিকের কৃষিকাজকে সহজ করত।
৪।শ্রম বিভাজন: এই অর্থনীতিতে শ্রম বিভাজন ছিল মূলত লিঙ্গ ও বয়সের ভিত্তিতে। পুরুষেরা সাধারণত শিকার বা মাছ ধরার মতো কঠিন কাজগুলি করত এবং নারীরা ফলমূল সংগ্রহ, বাচ্চাদের যত্ন এবং রান্নার মতো অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলি করত। খাদ্য উৎপাদনকারী সমাজে, কৃষিকাজ এবং পশুপালনের ক্ষেত্রেও একইরকম প্রাথমিক শ্রম বিভাজন পরিলক্ষিত হতো। এই সরল শ্রম বিভাজন জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য ছিল, তবে আধুনিক সমাজের মতো জটিল বা বিশেষায়িত শ্রমের ধারণা তখনো অনুপস্থিত ছিল।
৫।স্থিতিশীল জনপদ: কৃষি বা খাদ্য উৎপাদন শুরু হওয়ার পর মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে এবং তারা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ফসলের পরিচর্যা ও পশুপালনের সুবিধার জন্য তাদের নদী বা উর্বর ভূমির আশেপাশে বসতি স্থাপন করতে হতো। এই স্থায়ী বসতিগুলি ধীরে ধীরে গ্রাম ও শহরের জন্ম দেয়, যা সমাজ ও সভ্যতার বিকাশে ছিল এক বিশাল পদক্ষেপ। এই স্থিতিশীল জনপদ সৃষ্টি হওয়ার ফলেই স্থায়ী বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
৬।খাদ্যের নিশ্চয়তা: খাদ্য উৎপাদন বা কৃষির আবিষ্কার মানব সমাজকে খাদ্যের অভাবজনিত অনিশ্চয়তা থেকে অনেকটাই মুক্তি দেয়। তারা পরিকল্পিতভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে পারত এবং উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য সংরক্ষণ করতে পারত। এর ফলে অনাহারের ঝুঁকি কমে আসে এবং মানুষ আগের চেয়ে বেশি সুরক্ষিত ও নিশ্চিত জীবন লাভ করে। এই খাদ্যের নিশ্চয়তা সমাজকে অন্যান্য কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে, যা সভ্যতার দ্রুত বিকাশের পথ খুলে দেয়।
৭।সম্পত্তির ধারণা: খাদ্য উৎপাদন শুরু হওয়ার পর জমির মালিকানা ও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফসল ফলানোর জন্য যে জমি ব্যবহার করা হতো, তার উপর ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। এছাড়া উৎপাদিত ফসল ও গৃহপালিত পশুর উপরও মালিকানার ধারণা তৈরি হয়। খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজে যা অনুপস্থিত ছিল। এই সম্পত্তির ধারণা সমাজে শ্রেণিভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করে।
৮।জনসংখ্যা বৃদ্ধি: কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির হাত ধরে মানব সমাজে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। খাদ্যের প্রাচুর্য ও নিশ্চয়তার কারণে মৃত্যুর হার কমে আসে এবং জন্মের হার বৃদ্ধি পায়। স্থায়ী জীবনযাপন, খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনযাত্রার মান এর প্রধান কারণ ছিল। জনসংখ্যার এই স্ফীতি আরও বেশি পরিমাণে খাদ্য উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করে, যা কৃষি প্রযুক্তির বিকাশে সাহায্য করে এবং বৃহৎ সামাজিক কাঠামোর উত্থানে অবদান রাখে।
উপসংহার: খাদ্য সংগ্রহ থেকে খাদ্য উৎপাদনের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন মানবজাতির ইতিহাসে এক বিপ্লবী বাঁকবদল। খাদ্য সংগ্রহের অর্থনীতি যেখানে মানুষ প্রকৃতির অনুগামী ছিল, সেখানে খাদ্য উৎপাদনের অর্থনীতি মানুষকে প্রকৃতির উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়। এই মৌলিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলিই স্থায়ী বসতি, সম্পত্তির ধারণা, জটিল সমাজ এবং সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছে। এই বৈশিষ্ট্যগুলি বিশ্লেষণ করে আমরা বুঝতে পারি কীভাবে মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর কৌশল তাদের জীবনধারা, সমাজ কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ সভ্যতাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছে।

