- readaim.com
- 0
উত্তর।।উপস্থাপনা: ব্যাপ্তিবাদ নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা, যা মূলত সংস্কৃতি বা সামাজিক উপাদানের বিস্তার প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে। এটি দেখায় যে কীভাবে নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি, ধারণা বা জীবনধারা একটি নির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থল বা কেন্দ্র থেকে অন্যান্য অঞ্চলে বা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। মানব সমাজের বৈচিত্র্য ও সাদৃশ্যতার কারণ অনুসন্ধানে এই তত্ত্বটি ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।
ব্যাপ্তিবাদ (Diffusionism) শব্দটি দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়: নৃবিজ্ঞান/সমাজবিজ্ঞান এবং ভারতীয় দর্শন (নব্য-ন্যায়)। যেহেতু প্রশ্নটি একটি সামাজিক/সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে সহজবোধ্য উত্তর চেয়েছে এবং প্রাপ্ত তথ্যও মূলত নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে এসেছে, তাই এই দৃষ্টিকোণ থেকেই এর পরিচয় তুলে ধরা হলো।
শাব্দিক অর্থ
ব্যাপ্তিবাদ শব্দটি ইংরেজি ‘Diffusionism’-এর বাংলা প্রতিশব্দ। এর মূল শব্দ ‘Diffusion’-এর অর্থ হলো ছড়িয়ে পড়া, বিস্তার বা প্রসারণ। অতএব, শাব্দিক অর্থে ব্যাপ্তিবাদ বলতে এমন একটি মতবাদকে বোঝায় যা কোনো কিছু ছড়িয়ে পড়া বা বিস্তারের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
ব্যাপ্তিবাদ হলো এমন একটি তত্ত্ব বা মতবাদ যা মনে করে যে, একটি সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য (যেমন—প্রযুক্তি, ধারণা, রীতিনীতি, বিশ্বাস ইত্যাদি) স্বাধীনভাবে সৃষ্টি হওয়ার পরিবর্তে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র বা উৎপত্তিস্থল থেকে অন্য সমাজে ছড়িয়ে পড়ে (অর্থাৎ, এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে তা গৃহীত হয়)।
এই মতবাদের প্রবক্তারা সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদ্ভাবনের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ (Cultural Contact), অভিবাসন (Migration) এবং অনুকরণ (Imitation)-এর ওপর জোর দেন। নৃবিজ্ঞানীরা মূলত বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলির মিল খুঁজে বের করতে এবং তার বিস্তারের পথ বা প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করতে এই ধারণা ব্যবহার করেন। সমাজবিজ্ঞানেও এটি উন্নত বিশ্বের জ্ঞান, প্রযুক্তি বা উন্নয়নের মডেল অনুন্নত বিশ্বে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা ব্যাখ্যা করে।
বিভিন্ন গবেষক/মনীষীদের প্রদানকৃত সংজ্ঞা
নৃবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে ব্যাপ্তিবাদের নির্দিষ্ট, একক বা সর্বজনীন কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে এই তাত্ত্বিক ধারার মূল প্রবক্তাগণ এবং পরবর্তী গবেষকগণ এর মর্মার্থ তুলে ধরেছেন:
১। জি. ই. স্মিথ (G. Elliot Smith): ব্রিটিশ ব্যাপ্তিবাদের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা জি. ই. স্মিথ মনে করতেন যে, “সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন একটি একক কেন্দ্র, প্রাচীন মিশরে, একবারই ঘটেছিল এবং পরবর্তীকালে সেই কেন্দ্র থেকেই বিশ্বের অন্যান্য অংশে তা ছড়িয়ে পড়েছিল।”
২। ডব্লিউ. জে. পেরি (W. J. Perry): জি. ই. স্মিথের অনুসারী ডব্লিউ. জে. পেরি ব্যাপ্তিবাদকে এভাবে দেখেন যে, “সভ্যতা শুধুমাত্র একটি কেন্দ্রেই জন্ম নিয়েছিল এবং অভিবাসনের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তার বিস্তার ঘটেছিল।”
৩। ডব্লিউ. এইচ. আর. রিভার্স (W. H. R. Rivers): রিভার্স ব্যাপ্তিবাদকে সংস্কৃতি বিস্তারের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন এবং তাঁর মতে, “সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যগুলি স্বাধীন উদ্ভাবনের ফল নয়, বরং তাদের মধ্যেকার ঐতিহাসিক সংযোগ ও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের স্থানান্তরের প্রমাণ।” (
৪। ফ্রাঞ্জ বোয়াস (Franz Boas): যদিও বোয়াস ছিলেন ব্যাপ্তিবাদের একজন সমালোচক, তবুও তিনি সাংস্কৃতিক ইতিহাস ব্যাখ্যার একটি পদ্ধতি হিসাবে ডিফিউশনকে স্বীকার করতেন। তাঁর মতে, “বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সাদৃশ্যগুলি প্রায়শই ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন এলাকাগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক উপাদান বিনিময়ের ফল।”
৫। (সাধারণ গবেষকদের মতে): “ব্যাপ্তিবাদ হল সেই তত্ত্ব, যা মনে করে যে কোনো সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলোর উৎপত্তি বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীনভাবে ঘটেনি, বরং তা একটি কেন্দ্র থেকে পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে বিস্তৃত হয়েছে।”
৬। (সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে): “সমাজবিজ্ঞানে ব্যাপ্তিবাদ হলো উন্নত সমাজ বা বিশ্ব থেকে জ্ঞান, চিন্তা, প্রযুক্তি এবং সামাজিক মডেলসমূহ অনুন্নত সমাজে ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণকারী একটি ধারণা।”
ব্যাপ্তিবাদ হলো সংস্কৃতি ও সমাজ বিশ্লেষণের এমন একটি তাত্ত্বিক কাঠামো, যা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, জ্ঞান, প্রযুক্তি বা সামাজিক রীতিনীতির উৎপত্তিকে একটি একক বা সীমিত সংখ্যক কেন্দ্রে স্থাপন করে এবং যুক্তি দেখায় যে এই উপাদানগুলির সাদৃশ্য এবং উপস্থিতি মূলত অভিবাসন, যোগাযোগ ও অনুকরণের মাধ্যমে সেই কেন্দ্র থেকে পৃথিবীর অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ফল।
🔚 উপসংহার: ব্যাপ্তিবাদ মানব সমাজ ও সংস্কৃতির বিবর্তন ও পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছে। এই তত্ত্ব সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যের কারণ অনুসন্ধানে যোগাযোগ ও বিস্তার-এর ভূমিকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবর্তনবাদের একরৈখিক চিন্তাধারার বিকল্প প্রস্তাব করেছিল। যদিও এটি কঠোরভাবে সমস্ত সাংস্কৃতিক উদ্ভাবনকে একটি একক কেন্দ্রে আবদ্ধ করার জন্য সমালোচিত হয়েছে, তবুও সাংস্কৃতিক উপাদান স্থানান্তরের ধারণাটি আজও আধুনিক সমাজবিজ্ঞান এবং উন্নয়ন তত্ত্বেও (যেমন: উদ্ভাবনের বিস্তার তত্ত্ব) প্রাসঙ্গিক। সংক্ষেপে, এটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে মানব সমাজ কীভাবে একে অপরের কাছ থেকে শিখে এবং পরিবর্তিত হয়।

